স্বাস্থ্য
নিজস্ব প্রতিনিধি
সকালের পার্কে কিংবা সন্ধ্যার রাস্তায় হাঁটতে বেরোলেই দেখা যায়, অনেকের কানে ইয়ারফোন, হাতে মোবাইল বা চোখ স্মার্টওয়াচের পর্দায়। হাঁটার সময় গান শোনা, পডকাস্ট শোনা কিংবা ফোনে কথা বলা এখন খুবই সাধারণ অভ্যাস। কিন্তু সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি নতুন ওয়েলনেস ট্রেন্ড দ্রুত জনপ্রিয় হয়েছে—‘সাইলেন্ট ওয়াকিং’। অর্থাৎ কোনও গান, পডকাস্ট বা ফোন ছাড়াই শুধু নীরবে হাঁটা এবং সেই সময় পুরো মনোযোগ নিজের শরীর ও চারপাশের পরিবেশের দিকে রাখা। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কোনও কঠোর নিয়ম নয়, বরং সচেতনভাবে কিছু সময় নিজের সঙ্গে কাটানোর একটি সহজ উপায়।সাইলেন্ট ওয়াকিংয়ের মূল ধারণা হলো হাঁটার সময় বাহ্যিক শব্দের পরিবর্তে প্রকৃতির শব্দ, নিজের শ্বাস-প্রশ্বাস এবং শরীরের অনুভূতির দিকে মনোযোগ দেওয়া। পাখির ডাক, বাতাসের শব্দ, পাতার নড়াচড়া কিংবা নিজের পদচারণার শব্দ—এই ছোট ছোট বিষয়গুলিই হাঁটার অভিজ্ঞতাকে অন্যরকম করে তোলে। অনেকের মতে, এতে মন কিছুটা শান্ত হয় এবং প্রতিদিনের ব্যস্ততা থেকে সাময়িক মুক্তি পাওয়া যায়।মনোবিদদের মতে, সারাদিন আমরা অসংখ্য তথ্য ও নোটিফিকেশনের মধ্যে থাকি। কাজের চাপ, সামাজিক মাধ্যম, ই-মেল এবং ফোনকল মস্তিষ্ককে প্রায় সবসময় সক্রিয় রাখে। সাইলেন্ট ওয়াকিং সেই অবিরাম তথ্যপ্রবাহ থেকে কিছু সময়ের বিরতি দেয়। এই সময়টুকুতে মন কিছুটা ধীর হয় এবং নিজের চিন্তাভাবনাকে গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।এটি অনেকটাই মাইন্ডফুলনেস বা সচেতন উপস্থিতির অনুশীলনের মতো। হাঁটার সময় যদি আমরা বর্তমান মুহূর্তের দিকে মনোযোগ দিই, তাহলে ভবিষ্যতের দুশ্চিন্তা বা অতীতের অনুশোচনার পরিবর্তে বর্তমানকে অনুভব করা সহজ হয়। যদিও এটি কোনও চিকিৎসাপদ্ধতি নয়, তবুও অনেকের ক্ষেত্রে মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক হতে পারে।শারীরিক দিক থেকেও হাঁটার উপকারিতা সুপরিচিত। নিয়মিত হাঁটা হৃদ্যন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে, রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং পেশি ও হাড়কে সক্রিয় রাখতে সাহায্য করে। সাইলেন্ট ওয়াকিং এই পরিচিত উপকারিতার সঙ্গে মানসিক স্বস্তির একটি অতিরিক্ত মাত্রা যোগ করতে পারে।তবে সাইলেন্ট ওয়াকিং মানে যে সবসময় সম্পূর্ণ নীরব পরিবেশে হাঁটতে হবে, এমন নয়। শহরের ব্যস্ত পরিবেশেও মোবাইল দূরে রেখে কিছু সময় শুধু হাঁটার অভ্যাস গড়ে তোলা যেতে পারে। পার্ক, লেকের ধারে, গাছপালায় ঘেরা রাস্তা বা নিজের পাড়ার শান্ত এলাকায় হাঁটলে অভিজ্ঞতা আরও উপভোগ্য হতে পারে।বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই অভ্যাস শুরু করতে বড় কোনও প্রস্তুতির প্রয়োজন নেই। প্রতিদিন ১৫ থেকে ৩০ মিনিট ফোন সাইলেন্ট রেখে হাঁটুন। হাঁটার সময় বারবার মোবাইলের দিকে না তাকিয়ে শ্বাস-প্রশ্বাসের ছন্দ, হাঁটার গতি এবং চারপাশের দৃশ্য লক্ষ্য করুন। শুরুতে অস্বস্তি লাগলেও ধীরে ধীরে অনেকেই এই নীরবতার সঙ্গে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।তবে নিরাপত্তার বিষয়টি সবসময় মাথায় রাখতে হবে। নির্জন বা অপরিচিত জায়গায় হাঁটলে ফোন পুরোপুরি বন্ধ না রেখে জরুরি প্রয়োজনে ব্যবহারযোগ্য অবস্থায় রাখুন। রাস্তা পার হওয়ার সময় বা যানবাহন চলাচল করে এমন এলাকায় চারপাশের দিকে সতর্ক নজর রাখা জরুরি। নিরাপত্তার সঙ্গে কোনও আপস করা উচিত নয়।এটিও মনে রাখা দরকার যে সাইলেন্ট ওয়াকিং কোনও জাদুকরি সমাধান নয়। এটি উদ্বেগ, বিষণ্নতা বা অন্য কোনও মানসিক সমস্যার চিকিৎসার বিকল্প হতে পারে না। যদি দীর্ঘদিন ধরে মানসিক সমস্যা বা অতিরিক্ত উদ্বেগ থাকে, তাহলে অবশ্যই মনোবিদ বা চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। তবে সুস্থ জীবনযাপনের অংশ হিসেবে এই অভ্যাস অনেকের জন্য উপকারী হতে পারে।
বর্তমান সময়ে যখন প্রতিটি মুহূর্ত প্রযুক্তির সঙ্গে জড়িয়ে যাচ্ছে, তখন কিছুটা সময় নিজের জন্য আলাদা করে রাখা ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সাইলেন্ট ওয়াকিং সেই সুযোগই করে দেয়। কোনও গান নয়, কোনও নোটিফিকেশন নয়—শুধু নিজের সঙ্গে কিছুটা সময়, নিজের শ্বাসের শব্দ আর প্রকৃতির ছোঁয়া। হয়তো এই ছোট্ট অভ্যাসই ব্যস্ত জীবনে এনে দিতে পারে একটু বেশি শান্তি, স্বচ্ছতা এবং মানসিক প্রশান্তি।