28th Oct 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

ছাতুবাবু-লাটুবাবুর পুজো, উত্তর কলকাতার বনেদিয়ানার এক উজ্জ্বল অধ্যায়।

প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিনিধি


পুরনো কলকাতার গল্পে এমন কিছু নাম আছে, যাদের উচ্চারণ করলেই একটি গোটা সময় চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে ওঠে। ঘোড়ার গাড়ির শব্দ, গ্যাসবাতির আলো, জমিদারবাড়ির ঠাকুরদালান, বাবুদের আড্ডা, গানের আসর, পাখির লড়াই আর উৎসবের আড়ম্বর—উনিশ শতকের কলকাতার সেই বিচিত্র জীবনযাত্রার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে ছাতুবাবু-লাটুবাবুর নাম।

উত্তর কলকাতার বিডন স্ট্রিটের ঐতিহাসিক এই বাড়ি আজও সেই অতীতের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। ৬৭, বিডন স্ট্রিটের এই বাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে রামদুলাল দে বা রামদুলাল দেব সরকারের নাম। তিনি ছিলেন কলকাতার অন্যতম খ্যাতনামা ব্যবসায়ী এবং ভারত-মার্কিন বাণিজ্যের প্রাথমিক যুগের একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তাঁর দুই পুত্র আশুতোষ দেব ও প্রমথনাথ দেবই পরবর্তীকালে কলকাতার মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন ছাতুবাবু ও লাটুবাবু নামে।

তবে এই বাড়ির গল্প শুরু হয়েছিল তারও আগে। প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, ১৭৭০ সালে রামদুলাল দে এই বাড়িতে দুর্গাপুজোর সূচনা করেন। সময়ের সঙ্গে তাঁর দুই পুত্রের নামেই পুজোটি ছাতুবাবু-লাটুবাবুর পুজো হিসেবে পরিচিত হয়ে ওঠে। অর্থাৎ যে দুর্গোৎসব আজ বনেদি কলকাতার অন্যতম পরিচিত পুজো হিসেবে আলোচিত, তার শিকড় আসলে আঠারো শতকের কলকাতায়।

রামদুলাল দে-র জীবনও ছিল সেই সময়ের কলকাতার অর্থনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ব্যবসার জগতে তাঁর সাফল্য তাঁকে বিপুল সম্পদের অধিকারী করে তুলেছিল। বিদেশি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল। তাঁর মার্কিন বাণিজ্যিক অংশীদাররা তাঁকে যে সম্মান করতেন, তার একটি নিদর্শন হিসেবে তাঁর নামে জাহাজের নামকরণের কথাও বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রে পাওয়া যায়। ফলে ছাতুবাবু-লাটুবাবুর যে ঐশ্বর্যশালী জীবনযাপন পরবর্তী সময়ে কলকাতার লোককথার অংশ হয়ে ওঠে, তার ভিত তৈরি হয়েছিল আগের প্রজন্মের ব্যবসায়িক সাফল্যের উপরেই।

রামদুলালের দুই ছেলে অবশ্য নিজেদের মতো করে তৈরি করেছিলেন এক আলাদা পরিচয়। বড় ছেলে আশুতোষ দেব হয়ে উঠেছিলেন ছাতুবাবু, আর ছোট ছেলে প্রমথনাথ দেব পরিচিত হন লাটুবাবু নামে। তাঁদের জীবনযাত্রার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল তৎকালীন কলকাতার ‘বাবু কালচার’-এর নানা বৈশিষ্ট্য। বিপুল অর্থ, অবসর, শখ এবং সামাজিক প্রতিপত্তির মিশেলে যে এক বিশেষ নাগরিক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, ছাতুবাবু-লাটুবাবু ছিলেন তার অন্যতম পরিচিত মুখ।সেই বাবু-সংস্কৃতির সবচেয়ে আলোচিত দিকগুলির একটি ছিল বুলবুলির লড়াই। আজকের দিনে যা কল্পনা করাও অদ্ভুত মনে হতে পারে, সেই সময়ে কলকাতার বিত্তশালী সমাজে প্রশিক্ষিত বুলবুলির লড়াই ছিল এক ধরনের বিনোদন ও প্রতিযোগিতা। ছাতুবাবুর এই খেলায় প্রবল আগ্রহ ছিল বলে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ পাওয়া যায়। পাখিদের বিশেষভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়া হত, তাদের পরিচর্যার পিছনে ব্যয় হত বিপুল অর্থ। এমনকি কোন পাখির সম্ভাবনা কতটা, তার হিসেব নিয়েও নাকি চলত নানা রকম বিচার-বিশ্লেষণ।

এই অদ্ভুত শখের গল্প যতটা চমকপ্রদ, তার থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল এটি আমাদের পুরনো কলকাতার সামাজিক ইতিহাসের একটি ছবি দেখায়। কলকাতা তখন দ্রুত বদলাচ্ছে। বাণিজ্য বাড়ছে, নতুন ধনী শ্রেণি তৈরি হচ্ছে, ইউরোপীয় সংস্কৃতির নানা উপাদান শহুরে জীবনে প্রবেশ করছে। তার পাশাপাশি পুরনো জমিদারি ও অভিজাত সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে তৈরি হচ্ছে এক নতুন নাগরিক ‘বাবু’ পরিচয়। ছাতুবাবু-লাটুবাবুর বাড়ি সেই সময়েরই এক জীবন্ত দলিল। আর সেই জীবনযাত্রার কেন্দ্রে ছিল দুর্গাপুজো।

দুর্গাপুজো তখন কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠান ছিল না। বনেদি পরিবারগুলির কাছে এটি ছিল পারিবারিক মর্যাদা, সামাজিক যোগাযোগ এবং সাংস্কৃতিক পৃষ্ঠপোষকতা প্রদর্শনেরও একটি বড় উপলক্ষ। ঠাকুরদালান সাজতো, অতিথিদের আনাগোনা বাড়ত, সংগীত ও নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন হত। পরিবারের সদস্যরা দূরদূরান্ত থেকে ফিরে আসতেন। পুজোর কয়েকটি দিন বাড়ি হয়ে উঠত আত্মীয়স্বজন, বন্ধু, পরিচিত এবং এলাকার মানুষের মিলনক্ষেত্র।

ছাতুবাবু-লাটুবাবুর পুজোর বিশেষত্ব এখানেই। আড়াইশো বছরের কাছাকাছি দীর্ঘ ইতিহাস পেরিয়েও পুজোটি এখনও সেই বনেদি ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত। বিভিন্ন প্রকাশিত সূত্রে এই পুজোর বয়স প্রায় আড়াইশো বছর বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আঠারো শতকে শুরু হওয়া এই দুর্গোৎসব উত্তর কলকাতার বনেদি পুজোর ইতিহাসে তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে।

এই পুজোর আর একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হল দেবীর আরাধনার সঙ্গে দশমহাবিদ্যার ভাবনার সম্পর্ক। প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, এখানে মা দুর্গাকে দশমহাবিদ্যার রূপের সঙ্গে যুক্ত করে আরাধনা করা হয়। ফলে সাধারণ দুর্গাপুজোর পরিচিত কাঠামোর মধ্যে থেকেও দেবীকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিতে তৈরি হয় একটি আলাদা মাত্রা।পুজোর সূচনাও কেবল ষষ্ঠীর বোধন দিয়ে সীমাবদ্ধ নয়। প্রচলিত মতে, প্রতিপদ থেকেই শুরু হয় এই বাড়ির দুর্গোৎসবের প্রস্তুতি ও আচার। অর্থাৎ দেবীপক্ষের আগমন যেন অনেক আগে থেকেই এই বাড়ির অন্দরে অনুভূত হতে থাকে। কয়েকদিনের উৎসবের বদলে পুজো হয়ে ওঠে একটি দীর্ঘ পারিবারিক ও ধর্মীয় পর্ব।বনেদি বাড়ির পুজোর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ অবশ্য অনেক সময় প্রতিমার চেয়ে বেশি হয়ে ওঠে সেই বাড়ি নিজেই। ছাতুবাবু-লাটুবাবুর বাড়িতেও আজ অতীতের সমস্ত স্থাপত্য অক্ষত নেই। সময়, নগরায়ন এবং দীর্ঘদিনের ক্ষয়ের কারণে মূল বাড়ির অনেক অংশ হারিয়ে গেছে। পুরনো বাড়ির নাটমন্দির এবং কিছু ঐতিহাসিক উপাদান এখনও অতীতের সাক্ষ্য বহন করে। ফলে পুজোর সময়ে এখানে দাঁড়ালে দেবীর আরাধনার পাশাপাশি অনুভব করা যায় কলকাতার একটি হারিয়ে যাওয়া সময়ের উপস্থিতিও।

এই বাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আর একটি বিষয় হল তার সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার। সেই সময়ের বনেদি পরিবারগুলি কেবল ধর্মীয় উৎসবের আয়োজন করত না, নানা শিল্প ও বিনোদনের ক্ষেত্রেও পৃষ্ঠপোষকতা করত। গান, নাটক, কবিতা, আড্ডা, খেলাধুলা—সবকিছু মিলিয়েই তৈরি হয়েছিল কলকাতার সেই অভিজাত সংস্কৃতি, যার বহু স্মৃতি আজ ইতিহাসের পাতায়। ছাতুবাবু-লাটুবাবুর বাড়ির পুজো সেই বৃহত্তর সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলেরই অংশ।

তবে সময়ের সঙ্গে বনেদি কলকাতার চেহারা অনেক বদলে গেছে। যে বাবুদের জীবনযাত্রা নিয়ে একসময় শহরে গল্প তৈরি হত, তাঁদের প্রাসাদোপম বাড়ির অনেকগুলিই আজ ক্ষয়ে গেছে। বংশের মানুষ ছড়িয়ে পড়েছেন নানা জায়গায়। পুরনো পেশা, পুরনো শখ, পুরনো সামাজিক রীতির অনেকটাই হারিয়ে গেছে। বুলবুলির লড়াই এখন অতীতের গল্প; বাবুদের সেই বিপুল আড়ম্বরও আর নেই।কিন্তু দুর্গাপুজো থেকে গেছে।কারণ বনেদি বাড়ির পুজো আসলে শুধু একটি পরিবারের ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়। এটি স্মৃতির ধারক। প্রজন্ম বদলায়, বাড়ির দেওয়ালে বয়সের ছাপ পড়ে, শহরের রাস্তার নাম ও চেহারা বদলে যায়, কিন্তু পুজোর কয়েকটি দিনে সেই পুরনো বাড়িতে যখন আবার ধূপের গন্ধ ওঠে, শঙ্খ বাজে, ঢাকের শব্দ শোনা যায়, তখন অতীত আর বর্তমানের মধ্যে যেন একটি অদৃশ্য সেতু তৈরি হয়।

ছাতুবাবু-লাটুবাবুর পুজোর ক্ষেত্রেও সেই সেতুটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এই পুজোর মধ্যে একই সঙ্গে রয়েছে আঠারো শতকের ব্যবসায়ী কলকাতা, উনিশ শতকের বাবু সংস্কৃতি এবং আজকের ঐতিহ্যসচেতন শহর। একদিকে রামদুলাল দে-র বাণিজ্যিক সাফল্যের ইতিহাস, অন্যদিকে তাঁর পুত্রদের বিলাসী জীবনযাত্রার গল্প; একদিকে বুলবুলির লড়াইয়ের মতো অদ্ভুত শখ, অন্যদিকে দেবীর সামনে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা আরাধনা—সব মিলিয়েই তৈরি হয়েছে এই বাড়ির নিজস্ব পরিচয়।আজকের কলকাতায় পুজো মানেই আলো, মণ্ডপ, থিম আর অগণিত মানুষের ভিড়। তার মাঝেও বনেদি বাড়ির পুজোগুলি অন্যরকম। সেখানে বিস্ময় আসে আড়ম্বরের পরিমাণ থেকে নয়, সময়ের গভীরতা থেকে। একটি প্রতিমা, একটি ঠাকুরদালান, কয়েকটি পুরনো রীতি—এই সামান্য উপাদানই কখনও কখনও কয়েকশো বছরের ইতিহাসকে সামনে এনে দাঁড় করায়।ছাতুবাবু-লাটুবাবুর বাড়িও তেমনই এক ইতিহাসের ঠিকানা। কলকাতার ব্যস্ত রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা এই বাড়ি মনে করিয়ে দেয়, শহরের ইতিহাস শুধু বড় বড় স্থাপত্য বা সরকারি নথিতে লেখা থাকে না। কখনও তা লুকিয়ে থাকে একটি পরিবারের পুজোয়, একটি পুরনো নামের মধ্যে, একটি হারিয়ে যাওয়া শখের গল্পে, কিংবা শরতের সকালে ঠাকুরদালানে জ্বলে ওঠা প্রদীপের আলোয়।

তাই ছাতুবাবু-লাটুবাবুর দুর্গাপুজো দেখতে যাওয়া মানে শুধু একটি বনেদি বাড়ির পুজো দেখা নয়। যেন পুরনো কলকাতার দরজায় এক মুহূর্তের জন্য কড়া নাড়া। দরজা খুললেই দেখা যায়—এক শহর, যে শহর বহুবার বদলেছে, বহু স্মৃতি হারিয়েছে, তবু শরৎ এলেই তার কিছু পুরনো বাড়ির উঠোনে ফিরে আসে সেই চেনা দেবী।আর সেই প্রত্যাবর্তনের মধ্যেই বেঁচে থাকে ছাতুবাবু-লাটুবুর কলকাতা।

Archive

Most Popular