প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
কলকাতা শহর যতই বদলাক, তার কিছু পুরনো পাড়ার অন্দরমহলে এখনও সময় যেন নিজের গতি একটু ধীর করে রাখে। উত্তর কলকাতার দর্জিপাড়া তেমনই এক জায়গা। সরু রাস্তা, পুরনো বাড়ির কারুকাজ, খিলান, স্তম্ভ আর ইতিহাসের গন্ধ মাখা অলিগলির মধ্যে হঠাৎই চোখে পড়ে এমন কিছু বাড়ি, যাদের দরজা পেরোলেই মনে হয় শহরটি কয়েক শতক পিছিয়ে গেল। দর্জিপাড়া মিত্রবাড়ির দুর্গাপুজো সেই অতীতেরই এক জীবন্ত অধ্যায়।দুই শতকেরও বেশি সময় ধরে এই বাড়ির ঠাকুরদালানে দেবীর আরাধনা হয়ে আসছে। প্রকাশিত সূত্র অনুযায়ী, ১৮০৯ সালে রাধাকৃষ্ণ মিত্রের হাত ধরে এই পুজোর সূচনা। সময়ের হিসাবে দুই শতকেরও বেশি পুরনো এই দুর্গোৎসব আজও উত্তর কলকাতার বনেদি পুজোগুলির অন্যতম পরিচিত নাম। আর এই পুজোর সবচেয়ে বড় পরিচয় শুধু তার বয়স নয়—তার প্রতিমা, আচার এবং পারিবারিক পরম্পরার মধ্যেই রয়েছে বেশ কিছু এমন বৈশিষ্ট্য, যা তাকে অন্য অনেক বনেদি বাড়ির পুজো থেকে আলাদা করে।
এই পুজোর ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে মিত্র পরিবারের দীর্ঘ পথচলা। সেই গল্পের শুরু আরও আগে। পরিবারের পূর্বপুরুষ নীলমণি মিত্রের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কাশীবাসের এক অধ্যায়। ইংরেজ আমলে একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়ে অনিচ্ছুক হওয়ায় তিনি শেষ পর্যন্ত সম্পত্তি ছেড়ে কাশীতে চলে যান বলে পারিবারিক ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। সেখানে তাঁর মৃত্যু হয়। পরে তাঁর বিধবা পুত্রবধূ সন্তানদের নিয়ে কলকাতায় ফিরে আসেন এবং দর্জিপাড়ায় বসতি স্থাপন করেন। সেই পরিবারেরই অন্যতম সদস্য ছিলেন রাধাকৃষ্ণ মিত্র—যাঁর হাত ধরে শুরু হয় এই ঐতিহ্যবাহী দুর্গাপুজো।অর্থাৎ এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শুধু একটি বাড়ির ইতিহাস নয়, কলকাতায় একটি পরিবারের পুনর্বাসন ও নতুন করে শিকড় গাড়ার গল্পও। একসময় যে পরিবার কাশীতে আশ্রয় নিয়েছিল, তাদের পরবর্তী প্রজন্মই কলকাতার বুকে তৈরি করল এমন এক ঐতিহ্য, যা আজ দুই শতাব্দী পেরিয়েও টিকে আছে।রাধাকৃষ্ণ মিত্রের সঙ্গে রামদুলাল দে সরকারের পারিবারিক সম্পর্কও এই ইতিহাসকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলে। রাধাকৃষ্ণের সঙ্গে রামদুলাল দে-র বড় মেয়ের বিবাহ হয়েছিল। ফলে পুরনো কলকাতার দুই প্রভাবশালী পরিবারের ইতিহাসও কোথাও এসে মিলেছিল এই সূত্রে।
রাধাকৃষ্ণের পর পুজোর দায়িত্ব যায় তাঁর পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের হাতে। মেজ ছেলে রাজকৃষ্ণ, তাঁর পরে অমরেন্দ্রকৃষ্ণ, মানবেন্দ্রকৃষ্ণ—এভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পুজোর দায়িত্ব হাতবদল হয়েছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই হাতবদলের চরিত্রেও এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।
আজ এই পুজোর অন্যতম উদ্যোক্তা অনুসূয়া মিত্র বিশ্বাস এবং পরিবারের অন্যান্য মহিলা সদস্যরা। পরিবারের পুরুষ উত্তরসূরি না থাকায় বাড়ির মেয়েরাই পুজোর যাবতীয় দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। ফলে দুই শতকেরও বেশি পুরনো এই পুজো আজ এক অর্থে মহিলা পরিচালিত। বনেদি বাড়ির ঐতিহ্যের মধ্যে এমন পরিবর্তন সময়ের সঙ্গে সমাজের বদলে যাওয়ার ছবিটিও তুলে ধরে।তবে এই পুজোর সঙ্গে কোনও ট্রাস্ট বা শরিকি ব্যবস্থার সম্পর্ক নেই। পরিবারের নির্দিষ্ট সদস্যরাই সারা বছর ধরে অর্থ সঞ্চয় করেন এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সহযোগিতায় দুর্গোৎসবের আয়োজন করেন। ফলে পুজোটি এখনও মূলত একটি পারিবারিক দায়িত্ব ও উত্তরাধিকার হিসেবেই টিকে রয়েছে।
দর্জিপাড়া মিত্রবাড়ির প্রতিমার দিকে তাকালেই বোঝা যায়, এই পুজো সাধারণ দশভুজার পরিচিত প্রতিমার থেকে কিছুটা আলাদা। এখানে দেবীর বাহন সিংহ হলেও সেই সিংহের মুখটি ঘোড়ার মতো। এই ঘোড়ামুখো সিংহই প্রতিমার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। বৈষ্ণব ভাবধারার প্রভাব থাকা বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোগুলির মধ্যে এমন প্রতিমারীতি একেবারেই বিরল নয়, কিন্তু দর্জিপাড়া মিত্রবাড়ির প্রতিমায় তা বিশেষভাবে স্বতন্ত্র হয়ে উঠেছে।
প্রতিমা তৈরির ক্ষেত্রেও রয়েছে পারিবারিক ঐতিহ্য। রথের দিন কাঠামো পুজোর মধ্য দিয়ে প্রতিমা নির্মাণের কাজ শুরু হয়। দেবীর মূর্তি বাড়িতেই তৈরি করা হয় এবং পুরনো ছাঁচ অনুসরণ করে নতুন প্রতিমার রূপ দেওয়া হয়। অর্থাৎ প্রতি বছর নতুন প্রতিমা এলেও তার শরীরে লেগে থাকে বহু পুরনো এক রূপের স্মৃতি।
কুমোরটুলি থেকে আসে ডাকের সাজ। তারপর বাড়ির ছোট-বড় সকলে মিলে সেই প্রতিমাকে সাজিয়ে তোলেন। এই সাজানোর মুহূর্তটি শুধু পুজোর প্রস্তুতি নয়, পরিবারের সদস্যদের একসঙ্গে হয়ে ওঠারও একটি উপলক্ষ। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা একটি কাজ যখন নতুন প্রজন্মের হাতে পৌঁছয়, তখনই তো ঐতিহ্য সত্যিকারের জীবন্ত হয়ে ওঠে।
প্রতিপদ থেকেই শুরু হয় বোধনের আচার। তারপর সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত চলে কুমারী পুজো। অষ্টমীর দিন সন্ধিপুজোর পাশাপাশি হয় কল্যাণী পুজোও। আর এখানেই রয়েছে এই বাড়ির অন্যতম বিস্ময়কর রীতি।
দুর্গাপুজোর সন্ধিপুজোয় ১০৮টি পদ্ম নিবেদনের রীতি বহুল পরিচিত। কিন্তু দর্জিপাড়া মিত্রবাড়িতে পদ্মের পরিবর্তে ব্যবহার করা হয় ১০৮টি অপরাজিতা ফুল। নীল রঙের ছোট ছোট অপরাজিতা ফুলের সেই নিবেদন যেন দেবীর আরাধনায় একটি নিজস্ব পারিবারিক ভাষা তৈরি করেছে।
অষ্টমীর আর একটি বিশেষ রীতি হল চিনির নৈবেদ্য। বৈষ্ণব মতে পুজো হওয়ায় এখানে পাঁঠাবলির প্রথা নেই। তার পরিবর্তে দেবীর কাছে নিবেদন করা হয় চিনির নৈবেদ্য। অষ্টমীর দিনে পরিবারের সদস্যদের নাম ধরে সেই নৈবেদ্য নিবেদন করা হয়। বলির পরিবর্তে এই সরল নিবেদন দেবী আরাধনার এক ভিন্নতর ভাবনাকে সামনে আনে।নবমীর দিন হয় হোম এবং প্রদক্ষিণ। পুরনো নিয়ম মেনে দেবীর আরাধনা সম্পূর্ণ হয়। পুজোর প্রতিটি দিনেই তাই এমন কিছু আচার রয়েছে, যা কেবল ধর্মীয় রীতি হিসেবে নয়, পরিবারের নিজস্ব পরিচয়ের অংশ হিসেবেও টিকে আছে।
দশমীর দিন আসে বিদায়ের পালা। কনকাঞ্জলির পর বাড়ির মহিলারা দেবীর সামনে বসেন। তাঁদের প্রার্থনা—মায়ের মাতৃস্নেহ ও অপরাজিত শক্তি যেন তাঁদের মধ্যেও সঞ্চারিত হয়। এই প্রার্থনার মধ্যে যেন দর্জিপাড়া মিত্রবাড়ির বর্তমান সময়টিও ধরা পড়ে। যে পুজোর দায়িত্ব আজ বাড়ির মেয়েদের হাতে, সেই পুজোর দেবীর সামনে তাঁরাই শক্তির আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন।এরপর আসে বরণ। বাড়ির মহিলারা মাছ-ভাত খেয়ে, মুখে পান নিয়ে দেবীকে বরণ করেন। সেই পান সাজানোর মধ্যেও রয়েছে পারিবারিক রীতি। বনেদি বাড়ির পুজোয় খাবার, পান, নৈবেদ্য—এসব কখনও নিছক আনুষ্ঠানিক বিষয় নয়; প্রতিটি পদক্ষেপের সঙ্গে জুড়ে থাকে একটি করে পারিবারিক স্মৃতি।আর তারপর দেবীকে নিয়ে শুরু হয় বিসর্জনের যাত্রা।
দর্জিপাড়া মিত্রবাড়ির বিসর্জনের দৃশ্যও অন্যরকম। বাড়ির পুরুষ সদস্যরা ধুতি-পাঞ্জাবি পরে, হাতে ছড়ি নিয়ে দেবীকে কাঁধে তুলে নিয়ে যান। পুরনো দিনে এই যাত্রা হত খালি পায়ে। সময়ের সঙ্গে সেই নিয়মে সামান্য পরিবর্তন এসেছে—এখন পায়ে চপ্পল থাকে। কিন্তু দেবীকে কাঁধে তুলে নিয়ে যাওয়ার প্রথাটি এখনও বহমান।
এই সামান্য পরিবর্তনটিই যেন সময়ের সঙ্গে ঐতিহ্যের সম্পর্ককে সবচেয়ে সুন্দরভাবে বুঝিয়ে দেয়। সব রীতি হুবহু একই থাকে না। কিছু বদলায়, কিছু হারিয়ে যায়, আবার কিছু নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে টিকে থাকে। একসময় বিসর্জনের সময়ে নীলকণ্ঠ পাখি ওড়ানোর রীতিও ছিল এই বাড়িতে। বর্তমানে সেই প্রথা বন্ধ হয়েছে। কিন্তু দেবীকে কাঁধে করে নিয়ে যাওয়ার মতো বহু পুরনো রীতি এখনও অটুট।দুটি শতকেরও বেশি সময় ধরে এই পুজো কত কিছু দেখেছে! কলকাতার রাস্তায় ঘোড়ার গাড়ি থেকে মোটরগাড়ি এসেছে, গ্যাসবাতি থেকে বিদ্যুৎ, পুরনো বনেদি পাড়ার জীবন থেকে আধুনিক মহানগর। পরিবার বদলেছে, প্রজন্ম বদলেছে, বাড়ির দায়িত্ব বদলেছে। কিন্তু শরৎ এলেই মিত্রবাড়ির ঠাকুরদালানে আবার শুরু হয় সেই চেনা ব্যস্ততা।
আজকের দিনে এই পুজোর সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হয়তো তার আড়ম্বর নয়, তার ধারাবাহিকতা। কোনও বিশাল মণ্ডপ নেই, নেই শহরজোড়া প্রচারের প্রয়োজন। একটি পুরনো ঠাকুরদালান, একটি ঘোড়ামুখো সিংহ, ১০৮টি অপরাজিতা ফুল, চিনির নৈবেদ্য আর প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বহমান কিছু আচার—এই সামান্য উপাদানেই তৈরি হয়ে যায় এক বিশাল ইতিহাস।আর সেই ইতিহাসের আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল নারীর হাতে ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার। একসময় পুরুষদের হাত ধরে যে পুজো শুরু হয়েছিল, আজ তার দায়িত্ব বাড়ির মেয়েদের হাতে। তাঁরা শুধু পুজো ‘চালিয়ে’ যাচ্ছেন না; তাঁরা একটি পারিবারিক স্মৃতি, একটি সামাজিক ইতিহাস এবং একটি সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারকে পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন।
তাই দর্জিপাড়া মিত্রবাড়ির দুর্গাপুজোকে শুধু ২০০ বছরের পুরনো একটি বনেদি বাড়ির পুজো বললে তার গল্প অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এটি কলকাতার বদলে যাওয়া মুখের মধ্যে টিকে থাকা এক স্মৃতির বাড়ি। এখানে দেবীর প্রতিমায় যেমন পুরনো ছাঁচের ছাপ, তেমনই পুজোর দায়িত্বে বর্তমান সময়ের স্পষ্ট উপস্থিতি।শরতের সকালে যখন ঠাকুরদালানে ধূপের ধোঁয়া ওঠে, পুরনো খিলানের গায়ে আলো পড়ে, আর ঘোড়ামুখো সিংহের পাশে দাঁড়িয়ে দেবী দুর্গা যেন চেনা অথচ অন্যরকম এক রূপে ধরা দেন, তখন বোঝা যায়—ঐতিহ্য মানে অতীতকে হুবহু ধরে রাখা নয়। ঐতিহ্য মানে সময়ের সঙ্গে বদলাতে বদলাতেও নিজের মূল পরিচয়টুকু বাঁচিয়ে রাখা।দর্জিপাড়া মিত্রবাড়ির পুজো সেই জীবন্ত ঐতিহ্যেরই এক অনন্য উদাহরণ। দুই শতকেরও বেশি সময় পেরিয়ে আজও দেবী আসেন, পুজো হয়, পরিবারের মানুষ একত্র হন। আর পুরনো কলকাতার সেই ঠাকুরদালান নীরবে বলে যায়—শহর যতই বদলাক, কিছু কিছু বাড়িতে শরৎ এলেই ইতিহাস আবার বর্তমান হয়ে ওঠে।