প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
কলকাতার বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোর গল্প মানেই শুধু কয়েকশো বছরের পুরনো একটি পুজোর ইতিহাস নয়। তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কোনও পরিবারের উত্থান-পতন, বিশ্বাস ও সংস্কার, স্বপ্ন ও অলৌকিকতার গল্প, কখনও বা এমন কোনও কিংবদন্তি, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বয়ে চলে। ঠনঠনিয়ার লাহাবাড়ির দুর্গাপুজোও তেমনই এক পুজো। যার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে দেবীর স্বপ্নাদেশ, বৈষ্ণব পরিবারের নিজস্ব পুজোর রীতি, শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের স্মৃতি এবং এমন কিছু আচার, যা আজও অন্য অনেক বনেদি পুজোর থেকে তাকে আলাদা করে চেনায়।
লাহাবাড়ির পুজোর শিকড় অবশ্য কলকাতায় নয়, আরও পুরনো এক ইতিহাসের ভিতরে। প্রচলিত পারিবারিক কাহিনি অনুসারে, কয়েক শতাব্দী আগে লাহা পরিবারে দুর্গাপুজোর সূচনা হয়েছিল। দীর্ঘদিন পুজো চলার পরে নানা কারণে তা বন্ধ হয়ে যায়। তারপর একদিন দেবীর স্বপ্নাদেশে সেই বন্ধ পুজো আবার ফিরে আসে। সেই পুনরারম্ভের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ধর্মদাস লাহাকে ঘিরে একটি আশ্চর্য কাহিনি।
কথিত আছে, ১৭৭৫ সালের কোনও এক দিন জমি-জমা সংক্রান্ত একটি মামলার শুনানিতে চুঁচুড়ার আদালতে যাচ্ছিলেন ধর্মদাস লাহা। মামলার ফল তাঁর পক্ষে না গেলে বড় বিপদের আশঙ্কা ছিল। পথের ক্লান্তিতে একটি গাছের নীচে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে গিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন তিনি। আর সেই ঘুমেই যেন দেখা দিলেন এক ছোট্ট বালিকা। দেবীর মতোই সেই বালিকা তাঁকে জানাল, মামলায় তিনি জয়ী হবেন। তবে তার পরে তাঁকে নিজের গৃহে দুর্গাপুজো শুরু করতে হবে। বন্ধ হয়ে যাওয়া পূর্বপুরুষের পুজো আবার ফিরিয়ে আনতে হবে। এমনকী খানাকুল থেকে দুই পটুয়া এসে প্রতিমা গড়বেন বলেও সেই স্বপ্নে জানানো হয়েছিল।স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার পরে ধর্মদাস আদালতে পৌঁছন এবং আশ্চর্যজনকভাবে মামলায় জয়লাভ করেন। কিন্তু আনন্দের আবেগে স্বপ্নের কথা তাঁর আর মনে ছিল না। বাড়ি ফেরার পথে তিনি দেখা পেলেন দুই অপরিচিত মানুষের। তাঁদের কথায় যেন আবার ফিরে এল সেই স্বপ্নের স্মৃতি। তাঁরাও নাকি এক বালিকার নির্দেশ পেয়েছেন, কামারপুকুরে লাহাদের বাড়িতে দুর্গাপুজোর জন্য প্রতিমা গড়তে যেতে হবে। ধর্মদাস বুঝলেন, ঘটনাগুলি নিছক কাকতালীয় নয়। দেবী যেন নিজের পুজোর জন্য নিজেই ব্যবস্থা করে দিয়েছেন।
সেই থেকেই আবার শুরু হয় লাহাবাড়ির দুর্গাপুজো। পরিবারের বিশ্বাস, দেবীর ইচ্ছাতেই এই পুজোর পুনর্জন্ম। আর সেই বিশ্বাসই পরবর্তী প্রজন্মগুলির কাছে পুজোটিকে কেবল পারিবারিক উৎসব না রেখে এক ধরনের পারিবারিক সাধনার রূপ দিয়েছে।
লাহা পরিবার বৈষ্ণব মতাবলম্বী। তাই তাঁদের দুর্গাপুজোর দেবীমূর্তিতেও রয়েছে এক আশ্চর্য কোমলতা। যেখানে অধিকাংশ বনেদি বাড়ির দুর্গাপ্রতিমায় মহিষাসুরমর্দিনীর প্রচলিত রূপ দেখা যায়, সেখানে লাহাবাড়িতে মা দুর্গা আসেন হরগৌরী রূপে। অর্থাৎ দশভুজা, অসুরবধের তেজস্বী রূপে নয়, স্বামী শিবের কোলে বসা দেবী হিসেবে। এই রূপের মধ্যে যেন যুদ্ধের চেয়ে সংসারের মঙ্গল, শক্তির চেয়ে স্নেহ এবং উগ্রতার চেয়ে দাম্পত্যের কোমলতাই বড় হয়ে ওঠে।বৈষ্ণব পরিবারের বিশ্বাসের সঙ্গে এই রূপের একটি গভীর যোগ রয়েছে। মহিষাসুরবধের হিংস্রতার বদলে তাঁরা দেবীকে দেখেছেন গৃহের মঙ্গলময়ী শক্তি হিসেবে। তাই প্রতিমার রূপেও সেই দর্শনের ছাপ। মা এখানে যুদ্ধজয়ী দেবী নন, বরং ঘরের মেয়ে, ঘরের বধূ, সংসারের মঙ্গলরক্ষাকারী শক্তি।
এই পুজোর আর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল বলির রীতি। লাহাবাড়িতে কোনও পশুবলি হয় না। তার পরিবর্তে শসা ও ছাঁচিকুমড়ো নিবেদন করা হয় প্রতীকী বলি হিসেবে। দেবীর কাছে প্রাণহানির পরিবর্তে এই নিবেদন যেন বৈষ্ণব ভাবধারারই আর একটি প্রকাশ।
তবে লাহাবাড়ির পুজোর সবচেয়ে আলোচিত কিংবদন্তিগুলির একটি জড়িয়ে আছে শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের সঙ্গে। কথিত আছে, ১৮৪৮ সালে এক বালক লাহাবাড়ির দুর্গাপ্রতিমার চক্ষুদান করেছিলেন। সেই বালকের নাম তখন গদাধর চট্টোপাধ্যায়। পরবর্তী সময়ে যিনি হয়ে উঠবেন শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব।কামারপুকুরের লাহাবাড়ির আটচালার পাঠশালার সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের কথাও এই কাহিনির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, অতি অল্প বয়সেই তাঁর হাতে আঁকা দেবীর চোখ যেন মৃন্ময়ী প্রতিমাকে চিন্ময়ী করে তুলেছিল। সেই স্মৃতি আজও লাহাবাড়ির পুজোর অন্যতম গর্ব। একটি বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোর ইতিহাসে এমন একটি কিংবদন্তির উপস্থিতি নিঃসন্দেহে তাকে অন্য মাত্রা দিয়েছে।
লাহাবাড়ির পুজোর প্রস্তুতিও শুরু হয় নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে। বিপত্তারিণী পুজোর দিন কাঠামো পুজোর মাধ্যমে দেবীর আগমনের প্রস্তুতি শুরু হয়। মহালয়ার পরের দিন, অর্থাৎ প্রতিপদে ঘট উত্তোলন করা হয়। সেই দিন থেকেই বাড়িতে শুরু হয় চণ্ডীপাঠ। অর্থাৎ মহালয়ার আবহ পেরিয়ে যখন শহর ধীরে ধীরে পুজোর দিকে এগোতে শুরু করে, তখন লাহাবাড়ির অন্দরমহলেও দেবীকে ঘিরে শুরু হয়ে যায় দীর্ঘ সাধনা।
একসময় এই পুজোকে কেন্দ্র করে বাড়ির অঙ্গনে বসত যাত্রাপালার আসরও। মহালয়ার দিন থেকে ষষ্ঠী পর্যন্ত টানা যাত্রার আয়োজন হত। দূরদূরান্ত থেকে মানুষ সেই যাত্রা দেখতে আসতেন। বাড়ির উঠোন এবং আশপাশের এলাকা তখন প্রায় মেলার চেহারা নিত। বনেদি বাড়ির পুজো যে শুধু পরিবারের নিজস্ব উৎসব ছিল না, একসময় তা কীভাবে বৃহত্তর সমাজের সাংস্কৃতিক মিলনক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল, এই আয়োজন তারই একটি স্মারক।
আর অষ্টমীর সন্ধিপুজো? লাহাবাড়ির পুজোর সবচেয়ে স্মরণীয় দৃশ্যগুলির একটি।সন্ধিপুজোর সময়ে পরিবারের বিবাহিত মহিলারা ধুনো পোড়ানোর বিশেষ রীতিতে অংশ নেন। মাথায় এবং দুই হাতে মাটির সরা নিয়ে তার মধ্যে জ্বালানো হয় ধুনো। ধোঁয়ায় ভরে ওঠে ঠাকুরদালানের পরিবেশ। সারিবদ্ধভাবে বসে থাকা মহিলাদের শরীরের চারপাশে ধুনোর ধোঁয়া, সামনে দেবীমূর্তি, প্রদীপের আলো আর মন্ত্রোচ্চারণ—সব মিলিয়ে তৈরি হয় এক গভীর আধ্যাত্মিক আবহ।এই ধুনো পোড়ানোর রীতি শুধু কোনও বাহ্যিক প্রদর্শন নয়। পরিবারের মহিলাদের কাছে এটি ভক্তি, মানত, পারিবারিক বিশ্বাস এবং দেবীর কাছে আত্মনিবেদনের এক বিশেষ মুহূর্ত। প্রজন্ম বদলেছে, জীবনযাত্রা বদলেছে, কলকাতার চারপাশের শহর বদলে গিয়েছে, কিন্তু এই আচার এখনও লাহাবাড়ির পুজোর পরিচয়ের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে।
লাহাবাড়ির ভোগেও রয়েছে আলাদা বৈশিষ্ট্য। এখানে অন্নভোগ দেওয়া হয় না। পরিবর্তে নানা ধরনের মিষ্টি ও নাড়ু দিয়ে দেবীকে ভোগ নিবেদন করা হয়। বাঙালির দুর্গাপুজোয় যেখানে খিচুড়ি, ভোগের ডাল, তরকারি কিংবা ভাতের গন্ধ বহু বাড়ির পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে, সেখানে লাহাবাড়ির মিষ্টিমুখর ভোগ যেন তাদের নিজস্ব পারিবারিক রীতির আর একটি পরিচয়।
পুজোর শেষেও অবশ্য লাহাবাড়ির গল্প শেষ হয় না। বরং বিসর্জনের সময় এসে এই বাড়ির পুজো আরও একটি অভিনব রীতির জন্য আলাদা হয়ে ওঠে।প্রতিমা বিসর্জনের পরে বাড়ির প্রধান দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়। যেন মা চলে গেলেও সঙ্গে সঙ্গে বাড়ির দরজা তাঁর জন্য বন্ধ হয়ে যায় না। পরিবারের বিশ্বাসে, দেবী তখনও ঘরে আছেন। বিসর্জন সেরে বাড়ির কর্তা যখন ফিরে আসেন, তিনি বাইরে থেকে তিনবার ডাকেন, “মা আছেন ঘরে?” ভিতর থেকে উত্তর আসার পরেই খোলা হয় দরজা।কী আশ্চর্য এক প্রতীক! সারা বছর যে বাড়ি দেবীর আগমনের অপেক্ষায় থাকে, বিসর্জনের পরেও যেন বিশ্বাস করতে চায় না যে মা সত্যিই চলে গিয়েছেন। তাই দরজা বন্ধ থাকে। বাইরে থেকে ডাক আসে। ভিতর থেকে উত্তর আসে। তারপরই খুলে যায় দরজা। এই ছোট্ট আচারটির মধ্যেই যেন লুকিয়ে থাকে বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোর সবচেয়ে বড় আবেগ—বিসর্জন মানেই বিদায় নয়।
লাহাবাড়ির পুজো তাই কেবল ঠাকুরদালানে কয়েক দিনের উৎসব নয়। এটি একটি পরিবারের বহু প্রজন্ম ধরে বয়ে চলা বিশ্বাসের গল্প। এখানে দেবী এসেছেন স্বপ্নাদেশে, ফিরে এসেছেন বন্ধ হয়ে যাওয়া পুজোর মধ্যে দিয়ে। তাঁর রূপ বদলে হয়েছে হরগৌরী। বৈষ্ণব ভাবধারায় বদলেছে বলির অর্থ। শ্রীরামকৃষ্ণের স্মৃতিতে যুক্ত হয়েছে চক্ষুদানের কিংবদন্তি। ধুনোর ধোঁয়ায় আজও জেগে থাকে অষ্টমীর সন্ধ্যা। আর বিসর্জনের পরেও বন্ধ দরজার ওপারে থেকে যায় মায়ের উপস্থিতির বিশ্বাস।
কলকাতার বনেদি বাড়ির পুজোগুলির সৌন্দর্য আসলে এখানেই। প্রত্যেক বাড়ির মা দুর্গা যেন একই সঙ্গে একই এবং আলাদা। কোথাও তিনি যুদ্ধজয়ী মহিষাসুরমর্দিনী, কোথাও রাজরাজেশ্বরী, কোথাও অভয়ারূপী, আবার কোথাও স্বামী শিবের কোলে বসে থাকা হরগৌরী। প্রতিমার সেই বৈচিত্র্যের ভিতর দিয়েই প্রতিফলিত হয় পরিবারের ইতিহাস, ধর্মবিশ্বাস এবং জীবনদর্শন।
ঠনঠনিয়ার লাহাবাড়িতে তাই দুর্গাপুজো এলেই শুধু একটি প্রতিমা আসে না। ফিরে আসে কয়েক শতকের পুরনো এক গল্প। ফিরে আসে সেই ছোট্ট বালিকার স্বপ্নাদেশ, ফিরে আসে ধর্মদাস লাহার বিশ্বাস, ফিরে আসে গদাধরের আঁকা চোখের কিংবদন্তি, ফিরে আসে ধুনোর ধোঁয়ায় ভরা অষ্টমীর সন্ধ্যা। আর বিসর্জনের পরে বন্ধ দরজার ওপারে যেন থেকে যায় একটিই প্রশ্ন—মা কি সত্যিই চলে গেলেন? উত্তর আসে ভিতর থেকে। মা আছেন। বরাবরই আছেন।