28th Oct 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

পূর্ণচন্দ্র ধরের বাড়ির পুজো, দশভুজা নন, অভয়ারূপে মায়ের এক অন্যরকম প্রকাশ।

প্রতিবেদন

নিজস্ব প্রতিনিধি



বাংলার দুর্গাপুজোর সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য বোধহয় তার বৈচিত্র্যে। একই দেবী, একই পুরাণ, একই মহিষাসুরমর্দিনীর কাহিনি, অথচ বাংলার এক একটি পরিবারে তাঁর রূপ যেন একেবারেই আলাদা। কোথাও তিনি রাজরাজেশ্বরী, কোথাও সিংহবাহিনী, কোথাও ঘরের মেয়ে, আবার কোথাও দশভুজা নন, দুই হাতেই যেন ছড়িয়ে দেন আশ্বাস। সেই অন্যরকম দেবীরূপেরই এক অনন্য প্রকাশ পূর্ণচন্দ্র ধরের বাড়ির পুজোয়।

দুর্গার প্রচলিত মূর্তি আমাদের চোখে এতটাই পরিচিত যে দশটি হাত, হাতে নানা অস্ত্র, সিংহের পিঠে অধিষ্ঠিত দেবী এবং তাঁর পদতলে মহিষাসুর—এই ছবিটিই যেন দুর্গাপুজোর স্বাভাবিক প্রতিরূপ হয়ে উঠেছে। কিন্তু বাংলার প্রাচীন পারিবারিক পুজোগুলির দিকে তাকালে বোঝা যায়, দুর্গার ভাবনা কখনও এত সরল এক ছাঁচে বন্দি ছিল না। পরিবার, অঞ্চল, পারিবারিক বিশ্বাস এবং সময়ের প্রভাব অনুযায়ী দেবীর রূপেও এসেছে নানা পরিবর্তন। পূর্ণচন্দ্র ধরের বাড়ির অভয়ারূপী মা সেই বহুত্বেরই এক অসাধারণ নিদর্শন।

‘অভয়া’ শব্দটির মধ্যেই রয়েছে এই রূপের মূল তাৎপর্য। ভয় থেকে মুক্তি যিনি দেন, তিনিই অভয়া। হাতে অস্ত্র নিয়ে অসুরবধের দৃশ্যের পরিবর্তে এখানে দেবীর ভাবনায় প্রধান হয়ে ওঠে আশ্বাসের প্রতীক। তাঁর কাছে এসে ভক্ত যেন যুদ্ধের দেবীর সামনে নয়, আশ্রয়ের দেবীর সামনে দাঁড়ান। জীবনের ভয়, দুশ্চিন্তা, অনিশ্চয়তা এবং বিপদের মধ্যে মায়ের কাছে মানুষের চিরন্তন যে আশ্রয়প্রার্থনা, অভয়ারূপী দুর্গার মধ্যে তারই প্রকাশ।

এই রূপটি তাই শুধু প্রতিমার গড়নের পরিবর্তন নয়; এটি দেবীকে দেখার একটি আলাদা দৃষ্টিভঙ্গি। দুর্গা এখানে শুধু অশুভের বিনাশকারী নন, তিনি অভয়দাত্রীও। তাঁর কাছে শক্তি মানে শুধু অস্ত্রের শক্তি নয়, মানুষের মনে সাহস জাগিয়ে তোলার শক্তিও।বাংলার পারিবারিক পুজোগুলির ইতিহাসে এই ধরনের নিজস্ব প্রতিমারীতি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রতিমা কখনও শুধুমাত্র শিল্পীর কল্পনার ফল নয়। তার পিছনে থাকে পরিবারের বহু বছরের বিশ্বাস। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একটি নির্দিষ্ট রূপে দেবীকে দেখে আসার ফলে সেই রূপই হয়ে ওঠে পরিবারের কাছে ‘নিজেদের মা’। বাইরে থেকে দেখলে হয়তো সেই মূর্তিতে প্রচলিত দুর্গার সঙ্গে পার্থক্য চোখে পড়বে, কিন্তু পরিবারের মানুষের কাছে সেটিই সবচেয়ে পরিচিত, সবচেয়ে আপন।পূর্ণচন্দ্র ধরের বাড়ির পুজোও সেই ব্যক্তিগত বিশ্বাসের উত্তরাধিকার বহন করে। এখানে মায়ের অভয়ারূপ পুজোর মূল আকর্ষণগুলির অন্যতম। প্রতিমার দিকে তাকালে প্রথমেই মনে হয়, দেবী যেন তাঁর ভক্তের দিকে অস্ত্র উঁচিয়ে নয়, আশ্বাসের হাত বাড়িয়ে তাকিয়ে আছেন। এই দৃশ্যের মধ্যে যুদ্ধের উত্তেজনার বদলে রয়েছে এক গভীর প্রশান্তি।

বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতিতে মাতৃভাবনার সঙ্গে এই আশ্রয়ের সম্পর্ক অত্যন্ত পুরনো। দেবীকে কখনও শক্তি, কখনও সম্পদ, কখনও বিদ্যা, কখনও অন্নের প্রতীক হিসেবে ভাবা হয়েছে। কিন্তু সবকিছুর ঊর্ধ্বে রয়েছে ‘মা’-এর কাছে ফিরে যাওয়ার অনুভূতি। মানুষ যখন বিপদে পড়ে, তখন যুক্তির আগে যে শব্দটি মনে আসে, সেটিই হয়তো ‘মা’। অভয়ারূপী দুর্গার মধ্যে সেই আদিম মাতৃভাব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।এই কারণেই বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোকে শুধু প্রতিমা দর্শনের বিষয় হিসেবে দেখলে তার আসল গল্পটি ধরা পড়ে না। প্রতিমার প্রতিটি অঙ্গ, দেবীর মুখের ভাব, হাতের ভঙ্গি—সবকিছুর মধ্যেই পরিবারের ইতিহাসের কোনও না কোনও স্তর লুকিয়ে থাকে। একটি নির্দিষ্ট রূপ কেন এত বছর ধরে ধরে রাখা হয়েছে, তার উত্তর অনেক সময় পরিবারের প্রবীণদের স্মৃতিতে পাওয়া যায়। আর সেই স্মৃতিই পুজোকে ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত করে।

পুরনো কলকাতার বনেদি বাড়িগুলির পুজোতে আরও একটি বিষয় লক্ষণীয়—বাড়ির সঙ্গে দেবীর সম্পর্ক। বারোয়ারি পুজোয় দেবীকে দেখতে আসে শহর; পারিবারিক পুজোয় দেবী যেন নিজেই পরিবারের একটি অংশ। তিনি বছরের পর বছর একই বাড়িতে ফিরে আসেন। পরিবারের নতুন প্রজন্ম তাঁর সামনে বড় হয়। কারও বিয়ে হয়, কারও সন্তান জন্মায়, কেউ দূরে চলে যান, কেউ আর ফিরে আসেন না। তবুও পুজোর সময় সেই বাড়ির ঠাকুরদালানে মায়ের সামনে সবাই যেন একই স্মৃতির মধ্যে এসে দাঁড়ান।অভয়ারূপী দেবীর ভাবনার সঙ্গে এই পারিবারিক অনুভূতির একটি গভীর যোগ রয়েছে। কারণ অভয় শুধু বাহ্যিক বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়ার প্রতীক নয়। অনেক সময় অভয় মানে মানসিক আশ্রয়। জীবনের পরিবর্তনের মধ্যেও কিছু একটা একই রকম থাকবে—এই বিশ্বাস। সেই জায়গা থেকেই হয়তো পুরনো পুজো পরিবারের কাছে এত মূল্যবান হয়ে ওঠে।

একটি বনেদি বাড়ির পুজোর সবচেয়ে বড় সম্পদ তাই তার আড়ম্বর নয়। বহু পুরনো রীতি যদি আজও কোনওভাবে টিকে থাকে, পরিবারের মানুষ যদি এখনও পুজোর দিনগুলিতে একত্রিত হন, ছোটরা যদি বড়দের কাছ থেকে পুজোর গল্প শোনে, তাহলেই সেই ঐতিহ্য বেঁচে থাকে। সময়ের সঙ্গে সাজসজ্জা বদলাতে পারে, আয়োজনের ধরন বদলাতে পারে, অতিথির সংখ্যা কমতে বা বাড়তে পারে, কিন্তু দেবীর সঙ্গে পরিবারের সম্পর্কটি যদি অটুট থাকে, তাহলে পুজোর আত্মাও অটুট থাকে।আজকের কলকাতায় যখন দুর্গাপুজো ক্রমশ বৃহৎ উৎসবে পরিণত হয়েছে, তখন এই পারিবারিক পুজোগুলির দিকে ফিরে তাকানো যেন অন্য এক কলকাতাকে আবিষ্কার করা। সেই কলকাতা যেখানে পুজো মানে ছিল বাড়ির উঠোন, ঠাকুরদালান, ধূপের গন্ধ, শিউলির সুবাস, পুরনো বাসনের শব্দ, আত্মীয়দের আনাগোনা এবং পরিবারের নিজস্ব দেবী। কোনও একটি বাড়ির দেবীর রূপ হয়তো গোটা শহরের কাছে পরিচিত নয়, কিন্তু সেই পরিবারের কাছে তাঁর গুরুত্ব অপরিসীম।পূর্ণচন্দ্র ধরের বাড়ির অভয়ারূপী মা সেই ব্যক্তিগত ঐতিহ্যেরই স্মারক। দশটি হাতে অস্ত্র ধারণ করে মহিষাসুরবধের পরিচিত দৃশ্যের বাইরে তিনি মনে করিয়ে দেন, শক্তির আর একটি রূপ আছে—অভয় দেওয়ার শক্তি। ভয়কে জয় করার শক্তি। মানুষের পাশে থাকার শক্তি।

দুর্গাপুজোর দিনগুলিতে তাই এই মূর্তির সামনে দাঁড়ালে হয়তো মনে হয়, মা শুধু অসুরবধ করতে আসেননি। তিনি এসেছেন তাঁর সন্তানদের বলতে—ভয় পেয়ো না, আমি আছি। সেই একটি অনুভূতিই হয়তো শতাব্দী পেরিয়ে একটি পরিবারের পুজোকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট।কারণ শেষ পর্যন্ত দুর্গাপুজো শুধু দেবীর আগমন নয়, মানুষের মনে আশ্বাসেরও আগমন। আর পূর্ণচন্দ্র ধরের বাড়ির অভয়ারূপী মা সেই চিরন্তন আশ্বাসেরই এক বিরল, শান্ত এবং গভীর প্রকাশ।

Archive

Most Popular