প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
কলকাতার পুরনো পাড়াগুলির অলিগলিতে এখনও এমন কিছু বাড়ি আছে, যাদের দরজা পেরোলেই মনে হয় সময় একটু পিছিয়ে গেল। উঁচু ছাদ, পুরনো জানলা, প্রশস্ত উঠোন, ঠাকুরদালান আর দেওয়ালের গায়ে জমে থাকা বছরের পর বছর পুরনো স্মৃতি—সব মিলিয়ে সেই বাড়িগুলি যেন শহরের নিজস্ব ইতিহাসের অংশ। মুক্তারামবাবু স্ট্রিটের শীল পরিবারের দুর্গাপুজোও তেমনই এক ঐতিহ্য, যেখানে দেবীর আরাধনার সঙ্গে আজও জড়িয়ে আছে পুরনো পারিবারিক রীতি, ভোগের স্বতন্ত্রতা এবং পুজো উপলক্ষে পরিবারের মানুষের মিলন।
বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোর সবচেয়ে বড় সম্পদ তার ধারাবাহিকতা। সময়ের সঙ্গে শহর বদলেছে, মানুষের জীবনযাত্রা বদলেছে, পুজোর আয়োজনেও এসেছে নানা পরিবর্তন। কিন্তু কোনও পরিবার যদি তার পুরনো আচারগুলিকে যত্ন করে ধরে রাখে, তাহলে সেই পুজো শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠান থাকে না, হয়ে ওঠে পারিবারিক ইতিহাসের একটি জীবন্ত অধ্যায়। শীল পরিবারের পুজোর মধ্যেও সেই ধারাবাহিকতার ছাপ স্পষ্ট।পুরনো কলকাতার পুজো মানেই ছিল বাড়ির মানুষের ব্যস্ততা। পুজোর কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই শুরু হয়ে যেত প্রস্তুতি। বাড়ি পরিষ্কার করা, ঠাকুরদালান সাজানো, প্রয়োজনীয় সামগ্রী জোগাড় করা, আত্মীয়স্বজনকে খবর দেওয়া—সব মিলিয়ে পুজো ছিল দীর্ঘ প্রস্তুতির উৎসব। এখন সময় বদলেছে, অনেক কাজই বাইরে থেকে করানো সম্ভব। তবুও পুরনো বাড়ির পুজোর ক্ষেত্রে পরিবারের মানুষ নিজের হাতে কিছু কাজ করে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কারণ সেই কাজগুলির মধ্যেই লুকিয়ে থাকে অংশগ্রহণের আনন্দ।শীল পরিবারের পুজোর পুরনো রীতিগুলিও তাই কেবল আচার নয়, পরিবারের সঙ্গে পরিবারের যোগসূত্র। বছরের বাকি সময়ে যে সদস্যরা নানা কাজে, নানা শহরে ব্যস্ত থাকেন, পুজোর সময় তাঁরা আবার পুরনো বাড়িতে ফিরে আসেন। কেউ আসেন বহু দূর থেকে, কেউ হয়তো বছরের একমাত্র এই সময়টাতেই পরিবারের সকলের সঙ্গে একসঙ্গে থাকেন। দেবীর সামনে প্রণাম করার পাশাপাশি তাঁরা ফিরে পান নিজেদের শৈশবের দিনগুলিকেও।
একটি বনেদি বাড়ির পুজোয় এই ফিরে আসার অনুভূতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পুজো এখানে ক্যালেন্ডারের কয়েকটি দিন নয়; এটি যেন পরিবারের বার্ষিক পুনর্মিলন। বাড়ির প্রবীণ সদস্যদের কাছে পুজো মানে পুরনো মুখগুলিকে আবার একসঙ্গে দেখা। ছোটদের কাছে পুজো মানে নতুন জামা, আনন্দ আর অচেনা আত্মীয়দের সঙ্গে পরিচয়। আর মাঝের প্রজন্মের কাছে পুজো মানে দুই প্রজন্মের মধ্যে সেতু হয়ে দাঁড়ানো।এই মিলনোৎসবের সঙ্গে ভোগের সম্পর্কও গভীর। বাঙালির উৎসবে খাবার কখনও শুধু খাবার নয়। পুজোর ভোগে থাকে নিবেদন, পারিবারিক রীতি এবং ভাগ করে নেওয়ার আনন্দ। পুরনো বাড়ির রান্নাঘরে ভোগ রান্নার সময় যে ব্যস্ততা তৈরি হয়, তার মধ্যেও যেন উৎসবের আলাদা একটা সুর থাকে।
শীল পরিবারের পুজোর ভোগের ঐতিহ্য সেই পারিবারিক সংস্কৃতিরই অংশ। কোনও একটি পরিবারের ভোগের স্বাদ বাইরে থেকে যতই সাধারণ মনে হোক, পরিবারের কাছে তার মূল্য অন্যরকম। কারণ সেই স্বাদের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বহু পুরনো স্মৃতি। ছোটবেলায় পুজোর দিন যে খাবার খেয়েছেন, বড় হয়ে আবার সেই খাবার সামনে পেলে মুহূর্তেই ফিরে আসে পুরনো দিনের ছবি।এই স্মৃতির একটা বড় অংশ তৈরি হয় রান্নার পদ্ধতিতে। আগের প্রজন্মের হাতে যে ভাবে রান্না হত, পরের প্রজন্মও অনেক সময় সেই পদ্ধতি অনুসরণ করার চেষ্টা করে। পরিমাণের মাপ হয়তো কোনও খাতায় লেখা নেই। অভিজ্ঞ হাত জানে কখন মশলা দিতে হবে, কতক্ষণ আঁচে রাখতে হবে, কখন রান্না নামাতে হবে। এই ‘চোখের মাপ’ আর ‘হাতের আন্দাজ’-এর মধ্যেই বেঁচে থাকে বহু পুরনো রান্নার ঐতিহ্য।
ভোগের ক্ষেত্রে এই ধারাবাহিকতার গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ দেবীর উদ্দেশে নিবেদিত খাবার রান্নার সঙ্গে যুক্ত থাকে বিশেষ যত্ন ও নিয়ম। রান্নাঘরে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা থেকে শুরু করে উপকরণের নির্বাচন—সবকিছুর মধ্যেই থাকে পারিবারিক বিশ্বাস। কোনও পরিবারে নির্দিষ্ট কিছু পদ বহু বছর ধরে ভোগে দেওয়া হয়, কারণ সেটিই তাঁদের পূর্বপুরুষদের সময় থেকে চলে আসছে।মুক্তারামবাবু স্ট্রিটের মতো পুরনো কলকাতার পাড়ার আর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল প্রতিবেশী সম্পর্ক। একসময় বাড়ির পুজো মানেই শুধু পরিবারের সদস্যদের অনুষ্ঠান ছিল না। আশপাশের মানুষও তার সঙ্গে কোনও না কোনওভাবে যুক্ত থাকতেন। পুজোর খবর ছড়িয়ে পড়ত পাড়ায়। বাড়িতে অতিথি আসত, প্রসাদ যেত, পরিচিতরা দেখা করতে আসতেন। ফলে পারিবারিক পুজো ধীরে ধীরে পাড়ার সামাজিক জীবনেরও অংশ হয়ে উঠত।
আজকের ব্যস্ত শহুরে জীবনে সেই সম্পর্কের ধরন বদলেছে। তবু বনেদি বাড়ির পুজোর দিনগুলিতে পুরনো পাড়ার একটা আলাদা আবহ তৈরি হয়। একই রাস্তা দিয়ে মানুষ যাতায়াত করেন, কোনও পুরনো বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে কেউ তার ইতিহাসের কথা বলেন, আবার কেউ বহু বছর পর পরিচিত মুখ দেখতে পান। পুজো যেন সাময়িকভাবে পুরনো কলকাতাকে ফিরিয়ে আনে।
শীল পরিবারের পুজোর মতো ঐতিহ্যবাহী পারিবারিক আয়োজনের সবচেয়ে মূল্যবান দিক তাই তার দৃশ্যমান জাঁকজমক নয়। বরং যে রীতিগুলি সময়ের সঙ্গে টিকে আছে, সেগুলিই তার আসল সম্পদ। কারণ একটি পুজো যত পুরনোই হোক, যদি তার সঙ্গে যুক্ত পারিবারিক স্মৃতি হারিয়ে যায়, তাহলে শুধু বয়স দিয়ে ঐতিহ্য তৈরি হয় না।ঐতিহ্য তৈরি হয় তখনই, যখন কেউ সেই গল্প পরের প্রজন্মকে বলেন। কে প্রথম পুজো শুরু করেছিলেন, কেন কোনও বিশেষ রীতি পালন করা হয়, ভোগে কোন পদটি বিশেষ, কোন দিনে কীভাবে আয়োজন হয়—এই গল্পগুলি যখন ছোটরা শোনে, তখন তারা শুধু একটি পুজোর নিয়ম শেখে না। তারা নিজেদের পরিবারের ইতিহাস চিনতে শেখে।
এই শিক্ষার জায়গাটিই আজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আধুনিক জীবনে সন্তানদের বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরনো পারিবারিক পরিসর ছোট হয়ে আসছে। অনেকেই আর পূর্বপুরুষের বাড়িতে থাকেন না। তবুও পুজোর কয়েকটি দিন যদি তাঁরা সেই বাড়িতে ফিরে আসেন, দেবীর সামনে দাঁড়ান, ভোগের পাত ভাগ করে খান, তাহলে সম্পর্কের সেই সুতোটি ছিঁড়ে যায় না।মুক্তারামবাবু স্ট্রিটের শীল পরিবারের দুর্গাপুজো সেই সুতোই ধরে রাখে। পুরনো রীতির মধ্যে দিয়ে অতীতকে, ভোগের মধ্যে দিয়ে পারিবারিক স্মৃতিকে এবং মিলনোৎসবের মধ্যে দিয়ে বর্তমান প্রজন্মকে একসূত্রে বাঁধে।দুর্গাপুজো শেষ হয়ে গেলে বাড়ি আবার নিস্তব্ধ হয়ে যায়। ঠাকুরদালানের ভিড় কমে আসে, রান্নাঘরের ব্যস্ততা থামে, আত্মীয়রা একে একে নিজেদের শহরে ফিরে যান। কিন্তু পুজোর কয়েকটি দিনের স্মৃতি থেকে যায়। হয়তো পরের বছর আবার সবাই আসবেন, আবার একই নিয়মে পুজো হবে, আবার ভোগ রান্না হবে, আবার ছোটরা বড়দের কাছে পুরনো গল্প শুনবে।
এই পুনরাবৃত্তিই আসলে ঐতিহ্যের সবচেয়ে সুন্দর রূপ। প্রতি বছর একই পুজো, অথচ প্রতিবারই নতুন স্মৃতি। একই ঠাকুরদালান, অথচ নতুন প্রজন্ম। একই ভোগ, অথচ নতুন অতিথি। একই দেবী, অথচ তাঁকে ঘিরে পরিবারের গল্প ক্রমশ আরও দীর্ঘ।মুক্তারামবাবু স্ট্রিটের শীল পরিবারের পুজো তাই কেবল একটি বনেদি বাড়ির দুর্গোৎসব নয়। এটি পুরনো কলকাতার পারিবারিক সংস্কৃতির এক জীবন্ত দলিল—যেখানে রীতি টিকে থাকে বিশ্বাসে, ভোগ টিকে থাকে স্বাদে আর পরিবার টিকে থাকে একসঙ্গে থাকার অজুহাতে।
শরতের আকাশে কাশফুল দোলে, ঢাকের শব্দে শহর জেগে ওঠে। আর কোনও এক পুরনো বাড়ির ঠাকুরদালানে, পরিচিত মুখগুলির ভিড়ে, দেবীর সামনে দাঁড়িয়ে আবার মনে হয়—উৎসব যতই বদলাক, কিছু কিছু বাড়ির পুজো আসলে সময়কে বদলাতে দেয় না। তারা প্রতি বছর মানুষকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় নিজের শিকড়ের কাছে।