28th Oct 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

মিষ্টি, নোনতা, ভাজাভুজির উৎসবের পর শরীরকে কীভাবে ব্যালান্সে ফিরিয়ে আনবেন?

স্বাস্থ্য

নিজস্ব প্রতিনিধি


দুর্গাপুজো মানেই চার-পাঁচ দিনের বাঁধনহারা আনন্দ। সকাল থেকে রাত—প্যান্ডেল, আড্ডা, নতুন পোশাক, বন্ধুদের সঙ্গে দেখা, পরিবারের সঙ্গে খাওয়াদাওয়া আর তার মাঝেই একের পর এক পছন্দের খাবার। অষ্টমীর খিচুড়ি, নবমীর পোলাও-কষা মাংস, সন্ধ্যার ফুচকা কিংবা রোল, রাতের বিরিয়ানি, সঙ্গে মিষ্টি—পুজোর কয়েকটা দিন যেন ক্যালোরি গোনার জন্য তৈরি নয়। বরং এই কয়েকটা দিনেই বাঙালি নিজের খাবারের প্রতি ভালোবাসাকে সবচেয়ে বেশি উদ্‌যাপন করে।সমস্যা শুরু হয় পুজো শেষ হওয়ার পর। হঠাৎ মনে হয় শরীর ভারী, পেট ফাঁপছে, অস্বস্তি হচ্ছে, সকালে উঠতে ইচ্ছে করছে না। ওজন মাপলে হয়তো এক-দুই কিলো বেশি দেখাচ্ছে। তখন অনেকেই শুরু করে দেন কঠোর ডায়েট, সারাদিন শুধু ফল খাওয়া, না খেয়ে থাকা কিংবা নানা ধরনের ‘ডিটক্স’ পানীয়। অথচ পুজোর পর শরীরকে সামলে ওঠার জন্য এত কঠোর হওয়ার প্রয়োজন নেই। দরকার শুধু কয়েক দিনের জন্য খাবারের তালিকায় ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা এবং শরীরকে তার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরে আসার সুযোগ দেওয়া।

প্রথমেই বুঝতে হবে, পুজোর কয়েক দিনে ওজন সামান্য বেড়ে গেলে তার পুরোটাই যে শরীরে জমে যাওয়া চর্বি, এমন নয়। বেশি নুন খাওয়া, বেশি কার্বোহাইড্রেট গ্রহণ, অনিয়মিত সময়ে খাওয়া এবং কম ঘুমের কারণে শরীরে সাময়িকভাবে জল জমতে পারে। ফলে ওজনের কাঁটায় অতিরিক্ত সংখ্যা দেখা যেতে পারে। তাই পুজোর পরদিনই ভয় পেয়ে না খেয়ে থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।

শরীরকে ব্যালান্সে ফেরানোর প্রথম নিয়ম হল খাবারের সময় ঠিক করা। পুজোর সময় হয়তো দুপুরের খাবার বিকেলে হয়েছে, রাতের খাবার মধ্যরাতে। কখনও আবার দীর্ঘক্ষণ কিছু না খেয়ে হঠাৎ অনেকটা খাওয়া হয়েছে। উৎসব শেষ হলে ধীরে ধীরে নির্দিষ্ট সময়ে সকালের জলখাবার, দুপুরের খাবার এবং রাতের খাবারে ফিরে আসুন। মাঝখানে প্রয়োজন অনুযায়ী হালকা খাবার রাখতে পারেন। শরীর একটি নিয়মিত ছন্দ পেলে হজমের সমস্যাও অনেকটাই কমে।সকালের শুরুটা খুব ভারী খাবার দিয়ে না করাই ভালো। ঘুম থেকে উঠে পর্যাপ্ত জল পান করুন। এরপর নিজের অভ্যাস অনুযায়ী হালকা ও পুষ্টিকর জলখাবার বেছে নিতে পারেন। ডিম, দই, চিঁড়ে, ওটস, ফল, বাদাম বা সবজি দিয়ে তৈরি হালকা কোনও পদ হতে পারে সকালের খাবার। উদ্দেশ্য হল দিনের শুরুতেই শরীরকে পর্যাপ্ত প্রোটিন, আঁশ ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি দেওয়া, যাতে পরে অতিরিক্ত খিদে না পায়।

পুজোর পরে প্রোটিনের দিকে বিশেষ নজর দেওয়া জরুরি। উৎসবের খাবারে অনেক সময় ভাজাভুজি ও মিষ্টির পরিমাণ বেড়ে যায়, কিন্তু প্রতিদিনের খাবারে পর্যাপ্ত প্রোটিন থাকে না। ডিম, মাছ, মুরগি, ডাল, ছোলা, রাজমা, সয়াবিন বা দইয়ের মতো খাবার নিয়মিত রাখলে দীর্ঘ সময় পেট ভরা থাকে এবং খাবারের প্রতি অপ্রয়োজনীয় আকাঙ্ক্ষা কমতে পারে।বাঙালির দুপুরের পাতে ভাত থাকতেই পারে। পুজোর পরে শরীর ঠিক করার জন্য ভাত একেবারে বাদ দেওয়ার কোনও প্রয়োজন নেই। বরং পরিমাণটা নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী ঠিক করে তার সঙ্গে প্রচুর সবজি, ডাল এবং মাছ বা অন্য কোনও প্রোটিনের উৎস রাখুন। একেবারে কার্বোহাইড্রেট বাদ দেওয়ার বদলে পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করাই বেশি বাস্তবসম্মত। কারণ দীর্ঘদিনের খাদ্যাভ্যাস হঠাৎ বদলে ফেললে অনেকের ক্ষেত্রেই পরে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা দেখা দিতে পারে।

সবজির পরিমাণ বাড়ানো পুজোর পরের খাবারে একটি সহজ পরিবর্তন হতে পারে। পটল, ঝিঙে, লাউ, পুঁই, পালং, উচ্ছে, ফুলকপি, বাঁধাকপি, গাজর, বিনস—ঋতু ও পছন্দ অনুযায়ী বিভিন্ন সবজি রান্নায় রাখুন। সবজি শুধু পেট ভরাতে সাহায্য করে না, এতে থাকে আঁশ, ভিটামিন ও বিভিন্ন প্রয়োজনীয় উদ্ভিজ্জ উপাদান। তবে সবজিকে আবার অতিরিক্ত তেলে ভেজে খেলে উদ্দেশ্যটাই ব্যর্থ হবে। কম তেলে রান্না করা ঝোল, তরকারি, সেদ্ধ বা হালকা ভাজা বেশি উপযোগী।পুজোর সময় সবচেয়ে বেশি যে খাবারগুলির সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়, তাদের মধ্যে অন্যতম মিষ্টি। সন্দেশ, রসগোল্লা, লাড্ডু, জিলিপি থেকে শুরু করে নানা ধরনের পায়েস—উৎসবের আনন্দে মিষ্টি খাওয়ার সুযোগ অনেক বেড়ে যায়। পুজোর পরে তাই কয়েক দিন মিষ্টি ও অতিরিক্ত চিনি কমিয়ে দিন। কিন্তু ‘আর কোনও দিন মিষ্টি খাব না’—এমন কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ারও প্রয়োজন নেই। মাঝেমধ্যে অল্প পরিমাণে খাওয়া এবং প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় অতিরিক্ত চিনি না রাখা—এই ভারসাম্যটাই গুরুত্বপূর্ণ।

একই কথা প্রযোজ্য ভাজাভুজির ক্ষেত্রেও। পুজোর সময় ফুচকা, চপ, সিঙ্গারা, ফ্রাই, কাবাব কিংবা বিভিন্ন ধরনের তেলেভাজা খাওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু উৎসব শেষ হওয়ার পর প্রতিদিনের খাবার থেকে ভাজা খাবার কমিয়ে দিন। রান্নায় তেলের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করুন এবং ভাজার বদলে ঝোল, সেদ্ধ, গ্রিল বা বেক করা খাবার বেছে নিন।নুনের দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন। পুজোর বাইরের খাবারে নুনের পরিমাণ অনেক সময় বাড়তি হয়ে যায়। বেশি নুন শরীরে জল ধরে রাখার প্রবণতা বাড়াতে পারে, ফলে পেট বা শরীর ফোলা মনে হতে পারে। তাই পুজোর পর কয়েক দিন আচার, প্যাকেটজাত নোনতা খাবার, চিপস, অতিরিক্ত নোনতা ভুজিয়া বা প্রক্রিয়াজাত খাবার কমিয়ে দিন। রান্নায় প্রয়োজনমতো নুন ব্যবহার করাই যথেষ্ট।জলের কথাও ভুললে চলবে না। পুজোর সময় দীর্ঘক্ষণ বাইরে থাকা, গরমে ঘোরাঘুরি, চা-কফি বা অন্যান্য পানীয় বেশি খাওয়া—সব মিলিয়ে অনেকের পর্যাপ্ত জল খাওয়া হয় না। পুজোর পর নিয়ম করে জল পান করুন। তৃষ্ণা লাগার অপেক্ষা না করে সারা দিনে অল্প অল্প করে জল খাওয়া ভালো। শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী পরিমাণ বদলাবে; বিশেষ কোনও রোগ বা চিকিৎসাজনিত কারণে জল নিয়ন্ত্রণের পরামর্শ থাকলে অবশ্যই চিকিৎসকের নির্দেশ মেনে চলতে হবে।

অনেকে পুজোর পরে লেবু-জল, নানা হার্বাল পানীয় বা ‘ডিটক্স ওয়াটার’কে শরীর পরিষ্কার করার উপায় হিসেবে দেখেন। বাস্তবে শরীরের বর্জ্য অপসারণের নিজস্ব ব্যবস্থা রয়েছে, যার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে লিভার ও কিডনি। তাই কোনও বিশেষ পানীয় শরীর থেকে রাতারাতি ‘বিষাক্ত পদার্থ’ বের করে দেবে—এমন দাবি নিয়ে সতর্ক থাকা ভালো। সাধারণ জল, সুষম খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম এবং নিয়মিত চলাফেরাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।পুজোর পরে শুধু খাবার নয়, ঘুমের রুটিনও ঠিক করা জরুরি। কয়েক রাত ধরে দেরি করে ঘুমানো, ভোরে বাড়ি ফেরা এবং সকালে দেরিতে ওঠার ফলে শরীরের স্বাভাবিক ছন্দ বিঘ্নিত হয়। ঘুমের ঘাটতি হলে ক্ষুধা ও তৃপ্তির সঙ্গে সম্পর্কিত হরমোনের উপরও প্রভাব পড়তে পারে এবং অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা বাড়তে পারে। তাই উৎসব শেষ হলে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নিয়মিত ঘুমের সময় ফিরিয়ে আনুন।শরীরকে স্বাভাবিক ছন্দে ফেরানোর জন্য হাঁটাও একটি সহজ উপায়। পুজোর পরে হঠাৎ কঠিন শরীরচর্চা শুরু করার প্রয়োজন নেই। প্রতিদিন কিছুটা দ্রুত হাঁটা, সিঁড়ি ব্যবহার করা কিংবা নিজের দৈনন্দিন কাজের মধ্যে শরীরকে সক্রিয় রাখা দিয়ে শুরু করতে পারেন। যাঁরা নিয়মিত ব্যায়াম করেন, তাঁরা ধীরে ধীরে নিজেদের পুরনো রুটিনে ফিরতে পারেন।আর একটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—পুজোর পরে অপরাধবোধে ভুগবেন না। উৎসবের কয়েকটি দিন একটু বেশি খাওয়া মানেই নিজের প্রতি ‘অন্যায়’ করে ফেলেছেন, এমন নয়। খাবার শুধু পুষ্টির উৎস নয়, আমাদের সংস্কৃতি, আনন্দ ও সামাজিকতারও অংশ। পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে বসে একটি বিশেষ খাবার খাওয়ার স্মৃতিরও মূল্য আছে। সমস্যা হয় যখন উৎসবের খাবার সাময়িক আনন্দের জায়গা ছাড়িয়ে প্রতিদিনের অভ্যাসে পরিণত হয়।

তাই পুজোর পরের লক্ষ্য হওয়া উচিত শাস্তি নয়, ভারসাম্য। একদিন না খেয়ে থাকা নয়, বরং পরের দিন স্বাভাবিক খাবারে ফিরে আসা। সব মিষ্টি বন্ধ নয়, বরং পরিমাণ কমানো। ভাত একেবারে বাদ নয়, বরং পাতে সবজি ও প্রোটিন বাড়ানো। সারাদিন শুধু ফল নয়, বরং পূর্ণাঙ্গ ও সুষম খাবার। ঘণ্টার পর ঘণ্টা জিম নয়, বরং নিয়মিত হাঁটা ও নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী শরীরচর্চা।পুজোর পর কয়েক দিনের একটি সহজ প্লেট-নীতি মেনে চলতে পারেন। দুপুর বা রাতের খাবারে পাতে সবজির একটি ভালো অংশ, সঙ্গে প্রোটিনের উৎস এবং নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী ভাত বা রুটি রাখুন। ফল ও দইকে হালকা খাবার হিসেবে রাখা যায়। বাদাম বা বীজ অল্প পরিমাণে যোগ করা যায়। রান্নায় অতিরিক্ত তেল, চিনি ও নুন কমিয়ে দিন। অর্থাৎ কোনও একটি খাবারকে ‘ভিলেন’ না বানিয়ে পুরো খাদ্যতালিকাটাকেই ভারসাম্যপূর্ণ করুন।

তবে পুজোর পরও যদি দীর্ঘদিন ধরে পেটের সমস্যা, অস্বাভাবিক ক্লান্তি, বমি, তীব্র পেটব্যথা, মাথা ঘোরা বা অন্য কোনও শারীরিক সমস্যা থাকে, সেটিকে শুধু ‘বেশি খাওয়ার ফল’ বলে এড়িয়ে যাওয়া ঠিক নয়। প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।শেষ পর্যন্ত পুজোর পর শরীরকে ব্যালান্সে ফেরানোর সবচেয়ে সহজ মন্ত্রটি হল—কম নয়, ঠিক খাবার; না খেয়ে নয়, বুঝে খাওয়া। উৎসবের আনন্দ শেষ হয়েছে মানেই আনন্দের খাবারের সঙ্গে সম্পর্ক শেষ করতে হবে না। শুধু ফিরে আসতে হবে নিজের স্বাভাবিক ছন্দে।কারণ শরীরও তো পুজোর মতোই—তাকে যত্ন, বিশ্রাম, ভালোবাসা আর একটু নিয়ম দিলেই আবার নিজের ছন্দে ফিরে আসে।

Archive

Most Popular