28th Oct 2026

Highlights :

www.rojkarananya.com news

পুজোর পর লিভার ডিটক্স: কী খাবেন, কী খাবেন না?

স্বাস্থ্য

নিজস্ব প্রতিনিধি


দুর্গাপুজো মানেই আনন্দের সঙ্গে খাওয়াদাওয়ার এক দীর্ঘ উৎসব। অষ্টমীর ভোগ, নবমীর পোলাও-কষা মাংস, দশমীর পান্তা-ইলিশ, তার মাঝখানে মিষ্টি, ফুচকা, চপ, রোল, বিরিয়ানি, কাবাব—কোনওটাই যেন বাদ দেওয়ার নয়। কয়েকটা দিন নিয়মের বাইরে গিয়ে খাওয়াই উৎসবের স্বাভাবিক আনন্দ। কিন্তু পুজো শেষ হওয়ার পর অনেকেরই মনে হয়, শরীর যেন একটু ভারী হয়ে গেছে। পেট ফাঁপা, অস্বস্তি, অলসতা, মুখে ক্লান্তির ছাপ—সব মিলিয়ে তখন মনে হয়, ‘এবার লিভারটা ডিটক্স করা দরকার।’সেখান থেকেই শুরু হয় নানা ধরনের ডিটক্স ডায়েটের খোঁজ। কেউ সারাদিন শুধু ফল খান, কেউ কয়েক দিন শুধু জুস বা ডিটক্স ওয়াটার পান করেন, কেউ আবার একেবারে না খেয়ে থাকার চেষ্টা করেন। কিন্তু সত্যিই কি পুজোর পর লিভারকে আলাদা করে ‘ডিটক্স’ করাতে হয়?

আসলে আমাদের শরীরের নিজস্ব একটি অত্যন্ত কার্যকর বর্জ্য-প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থা রয়েছে। লিভার সেই ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান অঙ্গ। শরীরে প্রবেশ করা বিভিন্ন পদার্থকে প্রক্রিয়াজাত করা, পুষ্টি ব্যবহারে সাহায্য করা এবং নানা বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা—লিভারের কাজের পরিধি অনেক বড়। তাই কোনও বিশেষ পানীয় বা কয়েক দিনের ‘ডিটক্স ডায়েট’ লিভারকে হঠাৎ পরিষ্কার করে দেবে—এমন ধারণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি খুব সীমিত।বরং পুজোর পর লিভারের যত্ন নেওয়ার সবচেয়ে ভালো উপায় হল তাকে অপ্রয়োজনীয় চাপ না দেওয়া এবং নিয়মিত, সুষম খাদ্যাভ্যাসে ফিরে যাওয়া। কয়েক দিন একটু বেশি খাওয়া হয়ে গেলে শরীরকে শাস্তি দেওয়ার দরকার নেই। প্রয়োজন শুধু অভ্যাসটাকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জায়গায় ফিরিয়ে আনা।

প্রথমেই খাবারের সময় ঠিক করুন। পুজোর সময় হয়তো রাত জেগে খাওয়া হয়েছে, দুপুরের খাবার হয়েছে বিকেলে, আবার কোনও দিন দীর্ঘক্ষণ কিছু না খেয়ে হঠাৎ অনেকটা খাওয়া হয়েছে। উৎসব শেষ হওয়ার পর সকালের জলখাবার, দুপুরের খাবার ও রাতের খাবারের একটি নিয়মিত সময় তৈরি করুন। নিয়মিত খাবারের অভ্যাস সামগ্রিক বিপাকীয় স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী।পুজোর পর খাবারের তালিকায় শাকসবজি বাড়ানো একটি সহজ এবং কার্যকর পরিবর্তন। লাউ, ঝিঙে, পটল, পালং, পুঁই, ফুলকপি, বাঁধাকপি, গাজর, বিনস, উচ্ছে—যে সবজি আপনার পছন্দ, সেগুলি নিয়মিত রাখুন। সবজিতে থাকা আঁশ হজমের স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে সহায়তা করে এবং পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে। তবে ‘ডিটক্স’ করার জন্য শুধু কাঁচা সবজি খাওয়ার প্রয়োজন নেই। স্বাভাবিক, ঘরোয়া রান্নাই যথেষ্ট।

ফলের ক্ষেত্রেও একই কথা। পুজোর পরে ফল খাওয়া ভালো অভ্যাস, কিন্তু শুধু ফল খেয়ে কয়েক দিন কাটানো কোনও পূর্ণাঙ্গ খাদ্যতালিকা নয়। পেয়ারা, আপেল, কমলা, পেঁপে, ডালিম, কলা কিংবা ঋতুভেদে পাওয়া অন্যান্য ফল খাবারের অংশ হতে পারে। ফলের সঙ্গে পর্যাপ্ত প্রোটিন ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবারও রাখতে হবে।প্রোটিনের গুরুত্বও ভুলে গেলে চলবে না। ডিম, মাছ, মুরগি, ডাল, ছোলা, মুগ, মসুর, রাজমা, সয়াবিন, দই—বিভিন্ন উৎস থেকে প্রোটিন পাওয়া যায়। পুজোর পরে শুধু ‘হালকা খাবার’ খাওয়ার নামে যদি প্রোটিন বাদ পড়ে যায়, তাহলে খাদ্যতালিকা অসম্পূর্ণ হয়ে যেতে পারে। তাই ভারী মাংসের পদ কমিয়ে মাছ, ডিম, ডাল বা হালকা রান্নার মুরগির মতো উৎস বেছে নিতে পারেন।মাছ বাঙালির খাবারে এমনিতেই গুরুত্বপূর্ণ। পুজোর পর অতিরিক্ত তেল-মশলা দেওয়া মাছের পদ না খেয়ে ঝোল, পাতলা ঝোল বা কম তেলে রান্না করা মাছ রাখতে পারেন। ছোট মাছও পুষ্টিকর খাদ্যতালিকার অংশ হতে পারে। উদ্দেশ্য হল রান্নার ধরনকে হালকা করা, কোনও নির্দিষ্ট খাবারকে ‘ডিটক্স ফুড’ হিসেবে ঘোষণা করা নয়।

পুজোর পর মিষ্টি ও অতিরিক্ত চিনি কমানোও গুরুত্বপূর্ণ। কয়েক দিনের উৎসবে মিষ্টি বেশি খাওয়া হয়ে থাকলে কিছুদিন মিষ্টি, মিষ্টি পানীয়, প্যাকেটজাত মিষ্টি খাবার এবং অতিরিক্ত চিনি দেওয়া পানীয় কমিয়ে দিন। চা বা কফিতে চিনি কমানোও একটি সহজ পরিবর্তন। তবে কোনও খাবারকে আজীবনের জন্য নিষিদ্ধ করার প্রয়োজন নেই; মূল বিষয় হল নিয়মিত খাদ্যতালিকায় অতিরিক্ত চিনি না থাকা।ভাজাভুজির ক্ষেত্রেও একই নিয়ম। পুজোর পর কয়েক দিন চপ, সিঙ্গারা, পুরি, ফ্রাই, প্যাকেটজাত নোনতা খাবার এবং অতিরিক্ত তেলে রান্না করা পদ এড়িয়ে চলুন। রান্নায় তেলের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করুন। ঝোল, সেদ্ধ, ভাপা, গ্রিল বা কম তেলে রান্না করা খাবার বেছে নেওয়া যায়।

অতিরিক্ত নুনও কমানো ভালো। পুজোর বাইরের খাবারে নুনের পরিমাণ অনেক সময় বেশি থাকে। বেশি নুন শরীরে জল ধরে রাখতে পারে, ফলে পুজোর পর শরীর ফুলে বা ভারী মনে হতে পারে। আচার, চিপস, ভুজিয়া, অতিরিক্ত নোনতা বিস্কুট ও বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাবার কমিয়ে ঘরোয়া খাবারে ফিরলে এই সমস্যা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।

জল পান করার বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুজোর সময় ঘোরাঘুরি, রাতজাগা এবং অনিয়মিত জীবনযাত্রায় পর্যাপ্ত জল খাওয়া অনেকেরই হয়ে ওঠে না। শরীরের প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত জল পান করুন। তবে শুধু লেবু, শসা, পুদিনা বা অন্য কোনও উপাদান মিশিয়ে পান করলেই সেটি ‘ডিটক্স ওয়াটার’ হয়ে লিভার পরিষ্কার করবে—এমন ধারণা ঠিক নয়। সাধারণ জলই যথেষ্ট।পুজোর পর অ্যালকোহল খাওয়ার অভ্যাস থাকলে সেটি থেকে বিরতি নেওয়া বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত অ্যালকোহল লিভারের উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। যাঁরা নিয়মিত বা বেশি পরিমাণে অ্যালকোহল পান করেন, তাঁদের ক্ষেত্রে ‘ডিটক্স’ পানীয়ের চেয়ে অ্যালকোহল কমানো বা বন্ধ করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

এখানে একটি ভুল ধারণার কথাও বলা দরকার—‘হার্বাল’ বা ‘প্রাকৃতিক’ লেখা কোনও পণ্য মানেই তা লিভারের জন্য নিরাপদ, এমন নয়। কিছু ভেষজ বা খাদ্য-পরিপূরক উল্টে লিভারের ক্ষতি করতে পারে। তাই পুজোর পর নিজের মতো করে নানা ধরনের ডিটক্স সাপ্লিমেন্ট, হার্বাল মিশ্রণ বা অজানা উপাদানের পানীয় শুরু না করাই ভালো।লিভারের সুস্থতার সঙ্গে শরীরের ওজন ও বিপাকীয় স্বাস্থ্যেরও সম্পর্ক রয়েছে। তাই পুজোর পর হঠাৎ দ্রুত ওজন কমানোর চেষ্টা না করে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যকর অভ্যাস গড়ে তোলা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত হাঁটা বা শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম এবং সুষম খাবার—এই তিনটি অভ্যাসই অনেক বেশি কার্যকর।ঘুমের কথাও বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার। পুজোর সময় রাত জেগে ঠাকুর দেখা, আড্ডা কিংবা দূরে কোথাও ঘুরতে যাওয়া—সবই উৎসবের অংশ। কিন্তু উৎসব শেষ হওয়ার পর ঘুমের সময়টি নিয়মিত করুন। শরীরের বিপাকীয় স্বাস্থ্য এবং সামগ্রিক সুস্থতার জন্য পর্যাপ্ত ঘুম গুরুত্বপূর্ণ।

পুজোর পরের খাবার তাই খুব কঠিন কিছু হতে হবে না। সকালে ডিম ও সবজি দিয়ে হালকা জলখাবার, দুপুরে পরিমিত ভাতের সঙ্গে ডাল, সবজি ও মাছ, বিকেলে একটি ফল বা দই এবং রাতে হালকা খাবার—এই ধরনের সাধারণ ঘরোয়া খাদ্যাভ্যাসই যথেষ্ট। যাঁরা ভাত খান না, তাঁরা রুটি বা অন্য কোনও পূর্ণ শস্যের পরিমাণমতো বিকল্প রাখতে পারেন। মূল বিষয় হল খাবারে প্রোটিন, আঁশ, স্বাস্থ্যকর ফ্যাট এবং প্রয়োজনীয় কার্বোহাইড্রেটের ভারসাম্য রাখা।পুজোর পরে যদি কয়েক দিন পেট ভার লাগে, তাহলে খাবারের পরিমাণ একবারে খুব বেশি না করে অল্প অল্প করে খেতে পারেন। ধীরে ধীরে খাবার খান এবং খাবারের সঙ্গে অতিরিক্ত মিষ্টি পানীয় না রাখাই ভালো। খুব তেল-মশলাদার খাবার সাময়িকভাবে কমিয়ে দিলে হজমের অস্বস্তিও কমতে পারে।

তবে যদি চোখ বা ত্বক হলুদ হয়ে যায়, প্রস্রাবের রং অস্বাভাবিকভাবে গাঢ় হয়, তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, অস্বাভাবিক দুর্বলতা বা অন্য কোনও গুরুতর উপসর্গ দেখা দেয়, তখন কোনও ডিটক্স ডায়েট না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। একইভাবে যাঁদের আগে থেকেই লিভারের রোগ রয়েছে বা নিয়মিত কোনও ওষুধ খান, তাঁরা খাদ্যাভ্যাসে বড় পরিবর্তন আনার আগে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলবেন।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, পুজোর কয়েক দিনের খাবারকে ‘পাপ’ হিসেবে দেখার প্রয়োজন নেই। উৎসবের খাবার আমাদের সংস্কৃতিরই অংশ। কিন্তু উৎসবের আনন্দ শেষ হলে আবার নিজের স্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাসে ফিরে আসাটাই বুদ্ধিমানের কাজ। লিভারকে কোনও জাদুকরী পানীয় দিয়ে পরিষ্কার করার চেয়ে নিয়মিত স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।তাই পুজোর পর লিভার ডিটক্সের সহজতম সূত্র হতে পারে—ডিটক্স নয়, রিসেট। অতিরিক্ত মিষ্টি কমান, ভাজাভুজি কমান, অ্যালকোহল থেকে দূরে থাকুন, শাকসবজি ও ফল বাড়ান, পর্যাপ্ত প্রোটিন খান, জল পান করুন, ঘুম ঠিক করুন এবং প্রতিদিন একটু শরীরচর্চা করুন।

পুজোর আলো নিভে গেলে শরীরকেও ফিরিয়ে দিতে হয় তার নিজস্ব ছন্দ। কোনও কঠোর শাস্তি নয়, কোনও অলৌকিক ডিটক্স নয়—শুধু একটু যত্ন, একটু সংযম আর নিয়মিত জীবনে ফিরে আসা। সেটাই পুজোর পর শরীর ও লিভারের জন্য সবচেয়ে সুন্দর উপহার।

Archive

Most Popular