স্বাস্থ্য
নিজস্ব প্রতিনিধি
পুজোর দিনগুলিতে চুলও যেন আমাদের সাজের অন্যতম প্রধান চরিত্র। ষষ্ঠীর সকালে খোলা চুল, সপ্তমীতে বিনুনি, অষ্টমীতে খোঁপা, নবমীতে ওয়েভি হেয়ার কিংবা দশমীতে সিঁদুর খেলার জন্য বাঁধা চুল—প্রতিটি দিনের পোশাকের সঙ্গে বদলে যায় চুলের সাজও। তার সঙ্গে থাকে হেয়ার স্প্রে, সিরাম, জেল, মুস, কার্লিং আয়রন, স্ট্রেটনার, ব্লো-ড্রাই, হেয়ার পিন এবং নানা ধরনের স্টাইলিং প্রোডাক্ট। দিনের পর দিন প্যান্ডেলে ঘোরার ফলে ধুলোবালি, ঘাম ও দূষণও জমে চুলে। আর পুজোর রাতজাগা ও অনিয়মিত খাবারের প্রভাব তো থাকেই।
ফলে পুজো শেষ হতে না হতেই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মনে হয়—চুলটা যেন আর আগের মতো নেই। আগের জেল্লা নেই, রুক্ষ লাগছে, জট পড়ছে, আগের তুলনায় বেশি চুল উঠছে, মাথার ত্বকও কখনও চুলকোচ্ছে বা অস্বস্তি হচ্ছে। কিন্তু আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। কয়েক দিনের উৎসবের পর চুলকে আবার স্বাভাবিক ছন্দে ফিরিয়ে আনতে সবচেয়ে দরকার সঠিক পরিচর্যা এবং একটু ধৈর্য।প্রথম কাজ হল চুল ও মাথার ত্বক ভালোভাবে পরিষ্কার করা। পুজোর সময় একের পর এক স্টাইলিং প্রোডাক্ট ব্যবহার করলে সেগুলির কিছু অংশ চুলে জমে থাকতে পারে। তার সঙ্গে ঘাম, ধুলো এবং তেল মিশে চুলকে ভারী ও নিস্তেজ করে দিতে পারে। তাই পুজোর পর নিজের চুলের ধরন অনুযায়ী মৃদু শ্যাম্পু দিয়ে মাথার ত্বক ও চুল পরিষ্কার করুন। খুব গরম জল ব্যবহার না করাই ভালো, কারণ অতিরিক্ত গরম জল চুল ও মাথার ত্বকের স্বাভাবিক আর্দ্রতা কমিয়ে দিতে পারে।
শ্যাম্পু করার সময় শুধু চুলের গোড়ায় জোরে জোরে ঘষে ফেনা তৈরি করার প্রয়োজন নেই। আঙুলের ডগা দিয়ে আলতো করে মাথার ত্বক পরিষ্কার করুন। নখ দিয়ে ঘষলে মাথার ত্বকে ছোটখাটো আঁচড় বা জ্বালা তৈরি হতে পারে। শ্যাম্পু করার পর চুলের দৈর্ঘ্য অনুযায়ী কন্ডিশনার ব্যবহার করলে চুলের রুক্ষতা ও জট কমাতে সাহায্য করতে পারে। কন্ডিশনার সাধারণত মাথার ত্বকে না দিয়ে চুলের মাঝামাঝি অংশ থেকে ডগা পর্যন্ত লাগানোই ভালো।পুজোর সময় চুলে যদি অনেকটা স্প্রে, জেল বা অন্য স্টাইলিং প্রোডাক্ট ব্যবহার করে থাকেন, তবে একবারেই অত্যন্ত শক্তিশালী কোনও ক্লিনজিং প্রোডাক্ট ব্যবহার করার বদলে প্রয়োজন অনুযায়ী নিয়মিত পরিষ্কার করাই ভালো। খুব বেশি ঘষাঘষি করে চুল পরিষ্কার করতে গেলে উল্টে চুলের ক্ষতি হতে পারে।
চুলের জেল্লা ফেরাতে তেলের ভূমিকা নিয়েও অনেকের নানা ধারণা রয়েছে। পুজোর পর চুল যদি শুষ্ক ও রুক্ষ লাগে, তাহলে নিজের চুল ও মাথার ত্বকের উপযোগী তেল ব্যবহার করা যেতে পারে। তবে তেল মানেই যত বেশি, তত ভালো—এমন নয়। অল্প পরিমাণ তেল নিয়ে মাথার ত্বক ও চুলে প্রয়োগ করা যথেষ্ট। তেল লাগিয়ে অনেকক্ষণ বা সারারাত রেখে দিলেই চুল বেশি ভালো হবে, এমন প্রমাণও নেই। বরং যাঁদের মাথার ত্বক তৈলাক্ত বা খুশকির প্রবণতা রয়েছে, তাঁদের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত তেল অস্বস্তি বাড়াতে পারে।তেল লাগানোর সময় খুব জোরে মাথা ম্যাসাজ করার প্রয়োজন নেই। আঙুলের ডগা দিয়ে আলতোভাবে ম্যাসাজ করাই যথেষ্ট। জোরে ঘষলে চুলের গোড়ায় টান পড়তে পারে এবং ভঙ্গুর চুল আরও সহজে ছিঁড়ে যেতে পারে।
পুজোর সময় চুলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করতে পারে অতিরিক্ত তাপ। কার্লিং আয়রন, স্ট্রেটনার কিংবা বারবার ব্লো-ড্রাই করার ফলে চুলের বাইরের স্তর ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এর ফলে চুল রুক্ষ, শুষ্ক এবং ভঙ্গুর হয়ে পড়ে। তাই পুজোর পর অন্তত কিছুদিন চুলকে তাপ থেকে বিশ্রাম দিন। প্রয়োজন হলে হিট-প্রোটেক্ট্যান্ট ব্যবহার করে তারপর স্টাইলিং করুন এবং খুব বেশি তাপমাত্রা এড়িয়ে চলুন।চুল ভেজা অবস্থায় আঁচড়ানোর অভ্যাসও এড়ানো ভালো। ভেজা চুল তুলনামূলকভাবে বেশি ভঙ্গুর থাকে। তাই চুল ধোয়ার পর তোয়ালে দিয়ে জোরে ঘষে শুকানোর বদলে আলতো করে জল শুষে নিন। চুল কিছুটা শুকিয়ে গেলে চওড়া দাঁতের চিরুনি দিয়ে ধীরে ধীরে জট ছাড়ান। ডগা থেকে শুরু করে আস্তে আস্তে উপরের দিকে আসলে চুলে টান কম পড়ে।
পুজোর সময় আঁটসাঁট খোঁপা, পনিটেল বা বিনুনি করলে চুলের গোড়ায় টান পড়তে পারে। কয়েক দিন এমনভাবে চুল বাঁধার ফলে সাময়িক অস্বস্তি হতে পারে এবং নিয়মিত দীর্ঘদিন ধরে টানটান করে চুল বাঁধলে চুল পড়ার সমস্যাও বাড়তে পারে। তাই পুজোর পর কিছুদিন চুলকে ঢিলেঢালা করে রাখুন। খুব শক্ত রাবার ব্যান্ডের বদলে নরম হেয়ার টাই ব্যবহার করতে পারেন।চুলের যত্ন শুধু বাইরে থেকে করলেই হবে না। খাবারের দিকেও নজর দিতে হবে। পুজোর সময় মিষ্টি, ভাজাভুজি ও বাইরের খাবার বেড়ে গেলেও অনেক সময় প্রোটিন, শাকসবজি ও প্রয়োজনীয় পুষ্টির পরিমাণ কমে যায়। চুলের স্বাভাবিক বৃদ্ধির জন্য পর্যাপ্ত প্রোটিন, আয়রন, জিঙ্ক, ভিটামিন ও অন্যান্য পুষ্টি প্রয়োজন। তাই পুজোর পরে খাদ্যতালিকায় ডিম, মাছ, ডাল, দই, বাদাম, বীজ, শাকসবজি ও বিভিন্ন ফল রাখুন।বিশেষ করে প্রোটিনকে গুরুত্ব দিন। চুলের প্রধান উপাদান কেরাটিন, যা একটি প্রোটিন। খাদ্যতালিকায় পর্যাপ্ত প্রোটিন না থাকলে চুলের স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব পড়তে পারে। তাই শুধু দামি হেয়ার মাস্ক বা সিরামের উপর নির্ভর না করে প্রতিদিনের খাবারকে পুষ্টিকর করে তোলা জরুরি।
আয়রনের ঘাটতিও চুল পড়ার অন্যতম কারণ হতে পারে। তবে নিজের থেকে আয়রনের ওষুধ বা কোনও সাপ্লিমেন্ট শুরু না করে প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। রক্তপরীক্ষায় ঘাটতি থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তা পূরণ করা যেতে পারে। একইভাবে কোনও নির্দিষ্ট ভিটামিন বা মিনারেলের ঘাটতি আছে কি না না জেনে একগুচ্ছ সাপ্লিমেন্ট খাওয়া ঠিক নয়।পুজোর সময় রাতজাগা প্রায় অবধারিত। কিন্তু উৎসব শেষ হওয়ার পর ঘুমের সময়টা স্বাভাবিক করে তোলা দরকার। দীর্ঘদিনের ঘুমের ঘাটতি শরীরের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলে এবং স্ট্রেসও বাড়াতে পারে। চুলের ক্ষেত্রেও সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও জীবনযাত্রার ভূমিকা রয়েছে। তাই পুজোর পর কয়েক দিন অন্তত নিয়মিত ঘুমের অভ্যাস ফিরিয়ে আনুন।
স্ট্রেসের কথাও ভুলে গেলে চলবে না। উৎসব শেষ হওয়ার পর অনেকের কাজের চাপ, ঘুমের অনিয়ম এবং দৈনন্দিন ব্যস্ততা একসঙ্গে ফিরে আসে। অতিরিক্ত মানসিক চাপের কয়েক সপ্তাহ বা মাস পর কিছু মানুষের চুল পড়া বেড়ে যেতে পারে। তাই পুজোর পর শরীরকে যেমন বিশ্রাম দিতে হবে, মনকেও তেমন একটু সময় দিতে হবে।চুলের জেল্লা ফেরানোর জন্য ঘরোয়া হেয়ার মাস্ক ব্যবহার করতে চাইলে খুব জটিল কিছু করার প্রয়োজন নেই। নিজের চুলের ধরন অনুযায়ী কন্ডিশনিং উপাদান ব্যবহার করা যায়। তবে কাঁচা ডিম, লেবুর রস, বেকিং সোডা, অতিরিক্ত মশলা বা নানা অজানা উপাদান দিয়ে তৈরি ‘হেয়ার প্যাক’ ব্যবহার করার আগে সতর্ক থাকুন। মাথার ত্বকে অ্যালার্জি বা জ্বালা তৈরি হলে সমস্যা আরও বাড়তে পারে। কোনও নতুন পণ্য ব্যবহার করার আগে ছোট অংশে পরীক্ষা করে নেওয়াও ভালো।
খুশকি বা মাথার ত্বকে চুলকানি থাকলে অতিরিক্ত তেল লাগিয়ে সমস্যাটি ঢাকার চেষ্টা না করে কারণটি বোঝা দরকার। ছত্রাকজনিত খুশকি বা সেবোরিক ডার্মাটাইটিসের মতো সমস্যায় আলাদা চিকিৎসা প্রয়োজন হতে পারে। একইভাবে মাথার ত্বকে ঘা, লালচে ভাব, পুঁজ, তীব্র চুলকানি বা হঠাৎ প্রচুর চুল পড়া শুরু হলে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।আর একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—পুজোর পরে চুল একটু বেশি উঠলেই আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রতিদিন কিছু চুল পড়া স্বাভাবিক। তবে চুল পড়ার পরিমাণ হঠাৎ অনেক বেড়ে গেলে, মাথার নির্দিষ্ট জায়গায় চুল পাতলা হয়ে গেলে, টাকের মতো ফাঁকা জায়গা তৈরি হলে বা কয়েক সপ্তাহ ধরে সমস্যা চলতে থাকলে কারণটি খুঁজে দেখা দরকার।চুলের ডগা যদি অতিরিক্ত ফাটা থাকে, তবে শুধু তেল বা সিরাম দিয়ে সেটিকে স্থায়ীভাবে জোড়া যায় না। প্রয়োজন হলে সামান্য ট্রিম করে নেওয়াই ভালো। এতে চুলের স্বাস্থ্যকর চেহারা ফিরে আসে এবং জটও কম হয়।
পুজোর পরে চুলের জন্য একটি সহজ রুটিন হতে পারে—নিয়মিত মৃদু শ্যাম্পু, প্রতিবার প্রয়োজনমতো কন্ডিশনার, অতিরিক্ত তাপ ও টানটান করে বাঁধা এড়ানো, ভেজা চুলে সাবধানে চিরুনি করা, পর্যাপ্ত জল পান, পুষ্টিকর খাবার এবং পর্যাপ্ত ঘুম। এর সঙ্গে নিজের চুলের ধরন অনুযায়ী সিরাম বা তেল ব্যবহার করা যেতে পারে।সবশেষে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা—চুলের হারানো জেল্লা এক রাতের মধ্যে ফিরবে না। পুজোর কয়েক দিনের স্টাইলিংয়ের পরে চুলকে সুস্থ হতে একটু সময় দিতে হবে। দামি প্রোডাক্টের স্তর বাড়ানোর চেয়ে নিয়মিত ও কোমল পরিচর্যা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
পুজোর সাজ শেষ হয়েছে, এবার চুলেরও একটু বিশ্রাম হোক। কয়েক দিন স্ট্রেটনার ও কার্লিং আয়রনকে ছুটি দিন, চুলকে টানটান করে বাঁধা থেকে বিরতি দিন, পুষ্টিকর খাবার খান, ঘুমের রুটিন ঠিক করুন। ধীরে ধীরে ফিরে আসবে সেই স্বাভাবিক কোমলতা ও জেল্লা।কারণ পুজোর আলোর মতো চুলের সৌন্দর্যও সবচেয়ে বেশি ফুটে ওঠে তখনই, যখন তার ভিতরের স্বাস্থ্যটা ভালো থাকে।