প্রতিবেদন
নিজস্ব প্রতিনিধি
বাংলার বনেদি বাড়ির দুর্গাপুজোর গল্পে পুরাণ আর লোকবিশ্বাস পাশাপাশি হাঁটে। কোথাও দেবীর আগমনকে ঘিরে রয়েছে কোনও অলৌকিক কাহিনি, কোথাও স্বপ্নাদেশ, কোথাও আবার পরিবারের কোনও পূর্বপুরুষের দেখা অদ্ভুত স্বপ্ন থেকেই শুরু হয়েছে নতুন কোনও রীতি। এইসব গল্পই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে একটি পারিবারিক পুজোকে শুধু ধর্মীয় আচার নয়, এক গভীর আবেগের উত্তরাধিকারে পরিণত করে। ভোজেশ্বর পালচৌধুরী বাড়ির দুর্গাপুজোর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা স্বপ্নাদেশের কাহিনিও তেমনই এক গল্প, যেখানে স্বপ্নের নির্দেশেই যেন দেবী পেয়েছিলেন তাঁর এক নতুন রূপ।
বনেদি বাড়ির পুজোর ক্ষেত্রে ‘স্বপ্নাদেশ’ কথাটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। বাংলার লোকসংস্কৃতিতে দেবী বা দেবতার স্বপ্নে আবির্ভূত হয়ে কোনও নির্দেশ দেওয়ার কাহিনি বহু পুরনো। কখনও সেই নির্দেশে মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, কখনও কোনও নির্দিষ্ট রীতির প্রচলন হয়েছে, আবার কখনও প্রতিমার ধরনই বদলে গেছে। যুক্তির বিচারে এই গল্পের ব্যাখ্যা খোঁজা কঠিন হতে পারে, কিন্তু পারিবারিক বিশ্বাসের জায়গা থেকে এর মূল্য অপরিসীম। কারণ যে স্বপ্নকে একজন পূর্বপুরুষ দেবীর নির্দেশ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন, পরবর্তী প্রজন্মের কাছে সেটিই হয়ে ওঠে পরিবারের পুজোর অন্যতম প্রধান পরিচয়।
ভোজেশ্বর পালচৌধুরী বাড়ির পুজোর বিশেষত্বও সেই বিশ্বাসের জায়গায়। এখানে দেবীর প্রচলিত রূপের বাইরে একটি নিজস্ব রূপের সঙ্গে পুজোর ইতিহাস জড়িয়ে আছে। কথিত স্বপ্নাদেশের পর দেবীর রূপে যে পরিবর্তন এসেছিল, তা আর কেবল একজন শিল্পীর নকশা হয়ে থাকেনি। সময়ের সঙ্গে সেটিই পরিবারের নিজস্ব ঐতিহ্য হয়ে উঠেছে।
দুর্গাপুজোর প্রতিমা নিয়ে বাংলায় এমন বৈচিত্র্য নতুন কিছু নয়। কোনও পরিবারে দেবীর মুখ গোল, কোনও পরিবারে দীর্ঘ; কোথাও চোখের গড়ন আলাদা, কোথাও হাতের ভঙ্গি; কোথাও চালচিত্রে বিশেষ মোটিফ, কোথাও আবার দেবীর সঙ্গে থাকা পরিবারের সদস্যদের বিন্যাসেও রয়েছে নিজস্বতা। প্রতিমার এই বৈচিত্র্য আসলে বাংলার পারিবারিক পুজোর সাংস্কৃতিক মানচিত্রকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।ভোজেশ্বর পালচৌধুরী বাড়ির ক্ষেত্রে সেই নিজস্বতার পিছনে রয়েছে স্বপ্নাদেশের বিশ্বাস। অর্থাৎ দেবীর রূপ এখানে নিছক শৈল্পিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং ভক্তি ও বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত একটি স্মৃতি। পরিবারের কাছে সেই স্মৃতি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে প্রজন্ম বদলালেও দেবীর রূপ বদলায়নি। এভাবেই একটি স্বপ্ন ধীরে ধীরে ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠেছে।
বনেদি বাড়ির পুজোর গল্পে এই ‘রূপ’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ প্রতিমাই একটি পারিবারিক পুজোর দৃশ্যমান পরিচয়। একটি বাড়িতে বছরের পর বছর একই ধরনের দেবীমূর্তি তৈরি হলে সেই মূর্তির সঙ্গে পরিবারের আবেগও জমতে থাকে। ছোটবেলার স্মৃতি, ঠাকুরদালানের গন্ধ, পুজোর সকালে ঘুম ভাঙার শব্দ, ঢাকের আওয়াজ—সবকিছুর সঙ্গে মিশে যায় সেই পরিচিত মুখ। ফলে দেবীর রূপ বদলে দেওয়া মানে শুধু একটি মূর্তির পরিবর্তন নয়, পরিবারের স্মৃতির একটি বড় অংশ বদলে দেওয়া।এই কারণেই স্বপ্নাদেশে পাওয়া রূপের ধারাবাহিকতা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। এক প্রজন্ম যে দেবীকে দেখেছে, পরের প্রজন্মও তাঁকেই দেখে। পরিবারের ছোটরা যখন বড় হয়, তাদের কাছে সেই মূর্তিই দুর্গার স্বাভাবিক রূপ হয়ে ওঠে। হয়তো শহরের অন্য পুজোয় গিয়ে তারা অন্যরকম দুর্গামূর্তি দেখে অবাক হয়, কিন্তু বাড়ির মায়ের সামনে ফিরে এসে আবার সেই পরিচিত মুখটিই খুঁজে নেয়।
বাংলার বনেদি বাড়ির পুজোতে দেবীকে ঘিরে এই ব্যক্তিগত সম্পর্কই তাকে অন্যরকম করে তোলে। সর্বজনীন পুজোয় দেবী শহরের মানুষের, কিন্তু পারিবারিক পুজোয় তিনি একই সঙ্গে পরিবারেরও। তাঁর সামনে পরিবারের সুখ-দুঃখের ইতিহাস জমা হয়। বহু পুরনো কোনও ছবিতে হয়তো দেখা যায়, একই ঠাকুরদালানে দাঁড়িয়ে আছেন পরিবারের তিন-চার প্রজন্ম। সেই ছবির পিছনে যে দেবীমূর্তি, আজও হয়তো তাঁর রূপ অপরিবর্তিত।
স্বপ্নাদেশের গল্পগুলির আর একটি দিক হল বিশ্বাসের শক্তি। একটি পরিবার যখন কোনও ঘটনাকে দেবীর ইচ্ছা বলে গ্রহণ করে, তখন সেই বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় পরবর্তী সমস্ত প্রজন্ম। হয়তো সেই স্বপ্ন কে দেখেছিলেন, ঠিক কীভাবে নির্দেশ এসেছিল, তার বিবরণ আজ আর সম্পূর্ণভাবে মনে নেই। কিন্তু গল্পটি থেকে যায়। কারণ ইতিহাসের সবকিছু নথিতে লেখা থাকে না; কিছু ইতিহাস মানুষের স্মৃতিতে বেঁচে থাকে।এই মৌখিক ইতিহাস বাংলার বনেদি বাড়ির পুজোগুলির অন্যতম মূল্যবান সম্পদ। পরিবারের প্রবীণ সদস্যরা যখন ছোটদের বসিয়ে পুজোর পুরনো গল্প বলেন, তখন তাঁরা আসলে একটি সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার হস্তান্তর করেন। সেই গল্পে থাকে পূর্বপুরুষদের কথা, পুরনো বাড়ির কথা, দেবীর কথা এবং সেইসব ঘটনার কথা যা কোনও সরকারি ইতিহাসের বইয়ে পাওয়া যাবে না।
ভোজেশ্বর পালচৌধুরী বাড়ির পুজোর ক্ষেত্রেও স্বপ্নাদেশের কাহিনি সেই পারিবারিক স্মৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দেবীর নতুন রূপের জন্মের সঙ্গে যে অলৌকিকতার গল্প জড়িয়ে আছে, সেটিই পুজোটিকে দিয়েছে তার স্বাতন্ত্র্য। একই সঙ্গে এই গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বাংলায় ধর্মীয় সংস্কৃতি কখনও শুধুই শাস্ত্রনির্ভর ছিল না। লোকবিশ্বাস, পারিবারিক অভিজ্ঞতা, স্বপ্ন, আচার এবং স্থানীয় সংস্কৃতি মিলেমিশেই তৈরি করেছে তার নিজস্ব রূপ।
আজকের সময়ে দাঁড়িয়ে এই পুজোগুলির গুরুত্ব আরও বেড়েছে। কারণ শহরের দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পুরনো বাড়ি কমছে, যৌথ পরিবার ভাঙছে, পুরনো রীতির অনেকটাই হারিয়ে যাচ্ছে। তবু কিছু পরিবার এখনও নিজেদের পুজোকে ধরে রেখেছে। সেই ধরে রাখার মধ্যে শুধু ধর্মীয় দায়িত্ব নেই; রয়েছে নিজেদের শিকড়কে ধরে রাখার চেষ্টাও।পুজোর কয়েকটি দিন তাই পালচৌধুরী বাড়ির মতো বনেদি বাড়িগুলিতে যেন সময় একটু ধীরে চলে। বর্তমানের মানুষ দাঁড়িয়ে থাকেন অতীতের মানুষের পাশে। যে দেবীর সামনে কোনও এক পূর্বপুরুষ স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন বলে বিশ্বাস করা হয়, সেই দেবীর সামনেই আজকের প্রজন্মও প্রণাম করে। মাঝখানে পেরিয়ে যায় বহু বছর, বদলে যায় পৃথিবী, কিন্তু দেবীর সঙ্গে পরিবারের সম্পর্কটি থেকে যায়।আর সেই সম্পর্কের সবচেয়ে বড় প্রমাণ হয়ে থাকে দেবীর রূপ। যে রূপ একদিন স্বপ্নের নির্দেশে এসেছিল বলে পারিবারিক বিশ্বাস, আজ সেটিই ঐতিহ্য। একদিনের স্বপ্ন হয়ে উঠেছে প্রজন্মের স্মৃতি, স্মৃতি হয়ে উঠেছে রীতি, আর রীতি হয়ে উঠেছে একটি পরিবারের পরিচয়।
ভোজেশ্বর পালচৌধুরী বাড়ির দুর্গাপুজোর গল্প তাই শেষ পর্যন্ত স্বপ্ন আর বাস্তবের মাঝখানে দাঁড়ানো এক আশ্চর্য উত্তরাধিকার। দেবীর সেই বিশেষ রূপের দিকে তাকালে মনে হয়, বাংলার দুর্গাপুজোর ইতিহাস শুধু রাজা-জমিদার, প্রাসাদ আর আড়ম্বরের ইতিহাস নয়। তার মধ্যে এমন অসংখ্য ছোট-বড় পারিবারিক গল্প লুকিয়ে আছে, যেগুলির জন্ম হয়েছে বিশ্বাসে, বেঁচে আছে স্মৃতিতে এবং আজও ফিরে আসে শরতের নীল আকাশের নীচে।একটি স্বপ্ন থেকে শুরু হওয়া সেই গল্পই আজ একটি পরিবারের পুজোর পরিচয়—যেখানে দেবীর রূপ শুধু মাটির তৈরি প্রতিমা নয়, প্রজন্মের বিশ্বাসে গড়ে ওঠা এক জীবন্ত ঐতিহ্য।